বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মিরপুরের রাড্ডা ও মুক্তাদিরের ঘটনার পেছনে আসল দোষী কারা?

রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে সংঘবদ্ধ হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড। কয়েকশ মানুষের এই তাণ্ডবে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাসেবা কার্যত ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর ইসিবি চত্বরে নিউগিনি হাউজিং প্রকল্পেও সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠেছে। সেখানে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ আশপাশের স্থাপনায় চালানো হয়েছে লুটপাট ও ভাঙচুর। দুই ঘটনায়ই সামনে এসেছে সংঘবদ্ধভাবে লোক জড়ো করা, হামলা চালানো এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ। এক ঘটনায় সমমনা দোকানদার সমিতির বিরোধ ও জমি নিয়ে পুরোনো দ্বন্দ্বের সূত্র সামনে এলেও স্থানীয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। অন্য ঘটনায় আবাসন কর্তৃপক্ষ ও সালমান মুক্তাদিরের পক্ষ থেকে উঠেছে চাঁদা দাবির অভিযোগ, আর পুলিশের বক্তব্যে রয়েছে ভূমি দখল-বেদখল নিয়ে বিরোধের কথা। ফলে প্রশ্ন উঠছে—আলাদা দুই এলাকায় সংঘটিত এই হামলা-ভাঙচুরের নেপথ্যে কারা, কীভাবে সংগঠিত হলো এসব হামলা এবং কারা সরবরাহ করল হামলার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম?

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় বাসিন্দা, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে হামলার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাদের বিষয়ে তদন্ত এখনো চলছে।

মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে ১০ কাঠা জমির ওপর গড়ে ওঠা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে গত বৃহস্পতিবার রাতে কয়েকশ লোক জড়ো হয়ে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এই সমবায়ের কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্যও সামনে এসেছে।

সমবায় অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি সরকারের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন হয়। নির্বাচিত কমিটিতে সভাপতি মিজানুর রহমান হাজরা, সহসভাপতি কামাল উদ্দিন আহম্মদ, সম্পাদক মজিবুর রহমান গাজী, কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেন এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, মোহাম্মদ ছাকাওয়াত উল্ল্যাহ, আল-আমিন, কবির হোসেন গাজী ও আবু বকর ছিদ্দিকের নাম রয়েছে। পরে সমবায় অফিসে জমা দেওয়া কমিটিতে সহসভাপতি পদে কাজী মকবুল হোসেন এবং সম্পাদক পদে শাহ আলম গাজীকে ‘কো-অপ্ট’ করা হয়।

সমিতির একাধিক সদস্য ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এর বর্তমান সদস্য ৯১ জন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেল, আব্দুর রহমান হাজরা, মাহবুবুর রহমান শান্ত ও মনির হোসেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনেই রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। হামলার সময় স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাদেরও বিভিন্ন ভূমিকায় দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ ব্যক্তির মুখে মুখোশ ছিল। শাহ স্মৃতি মার্কেটের নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

তবে পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সমবায় সমিতির সম্পাদক শাহ আলম গাজী ও কাজী মকবুল হোসেন রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে শাহাদাত হোসেন, আতিকুর রহমান, কামরুল ইসলাম, শাকিল, সোহেল, জুয়েল, জিহাদ হাসান ও রাব্বিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ ও মামলার তদন্তে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সহকারী কমিশনার জাকির হোসেন বলেন, তদন্তে যাদের নাম আসবে, তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।

রাড্ডা সেন্টারের সঙ্গে সমমনা সমবায় সমিতির বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে জমি। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে সমিতিটি গঠিত হয়। ২০০১ সালের দিকে এটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একই নিবন্ধন থাকলেও দুটি কমিটি গঠন করা হয়। এক অংশে বর্তমানে ৫৬ জন সদস্য থাকলেও কোনো কমিটি নেই। অন্য অংশের সভাপতি মিজানুর রহমান হাজরা এবং এ অংশে ৯১ জন সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন দুই অংশেরই সদস্য বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে সমিতি জমিটি বরাদ্দ পায়। তৎকালীন স্থানীয় কাউন্সিলর ও সমিতির সদস্য মিষ্টি বরাদ্দের টাকাও জমা দেন। ২০২১ সালের দিকে সমিতির নামে জমিটি নিবন্ধন হয়। তবে দখল নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে সমিতির অন্য অংশ আদালতে মামলা করে। সেই মামলা এখনো চলমান।

অন্যদিকে, মামলার বিবরণ অনুযায়ী হামলার সময় রাড্ডা সেন্টারের আসবাব ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুরের পাশাপাশি আলট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও পরীক্ষাগারের কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙা হয়। বিভিন্ন ওষুধ ও সামগ্রী, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও স্টিলের আলমারি নিয়ে যায় হামলাকারীরা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, লুট হওয়া মালামালের কিছু অংশ স্থানীয় কয়েকটি ভাঙাড়ির দোকানে পাওয়া গেছে।

হামলায় ব্যবহৃত খননযন্ত্রটি স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতা নিয়ে এসেছিলেন বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। ঘটনার সময় স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা একটি গাড়িতে করে আশপাশে অবস্থান করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই সময়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসও দেখা গেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় একটি হামলার প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া হলো এবং কারা এর পেছনে ছিল? কারণ কয়েকশ মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করা, খননযন্ত্রের ব্যবস্থা করা, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং পরে সমিতির সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানোর ঘটনাগুলো পরপর ঘটেছে।

ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় পুলিশ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে শাহ আলী থানার তৎকালীন ওসি জাহাঙ্গীর আলমের দায়িত্বে গাফিলতি পাওয়ার কথা জানানো হয়। তদন্ত কমিটির সূত্র অনুযায়ী, দখলের বিষয়টি তিনি আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও যথাসময়ে জানাননি। ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পাওয়ার পরও বেশ কিছু সময় পরে ঘটনাস্থলে যান বলে তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা যায়।

এরপর ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় প্রশ্ন যখন উঠছে হামলাকারীদের পরিচয় ও নেপথ্যের শক্তি নিয়ে, তখন প্রায় একই সময়ে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি হাউজিং প্রকল্পেও সংঘবদ্ধ হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ সামনে এসেছে। সেখানে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের পাশাপাশি আশপাশের ভবনেও হামলার অভিযোগ রয়েছে।

সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর একজন বলেন, ‘লোকজন তো অনেক সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল, ওরা এসেই মানে যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে, ভাঙচুর করে যেটা নিতে পারছে সেটা নিছে, যেটা নিতে পারে নাই সেটা ভাঙচুর করছে।’

হাউজিং কর্তৃপক্ষের দাবি, কয়েকদিন আগে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। এর আগেও একই কায়দায় হামলার ঘটনা ঘটেছিল বলে মালিকপক্ষের দাবি। সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগ, বিএনপির লোকজন তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রতিশোধ হিসেবে তাঁর স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়।

তবে পুলিশের বক্তব্যে ঘটনাটিকে ভূমি দখল-বেদখল নিয়ে বিরোধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিএমপির ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘পুলিশ গেছি আমরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছি। আমরা দুইটা ছড়রা উদ্ধার করছি, কিছু গুলির খোসা উদ্ধার করছি। ভূমি দখল-বেদখল নিয়ে বিরোধ।

দুটি ঘটনায় অভিযোগের ধরন আলাদা হলেও সামনে এসেছে কয়েকটি প্রশ্ন—কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করছে, কারা তাদের সরঞ্জাম দিচ্ছে, জমি বা অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে কারা যুক্ত, হামলার পর কার স্বার্থ বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন এসব ঘটনা ঠেকাতে পারছে না?

পড়ুন: সাইবার সুরক্ষা আইন মিডিয়াকে টার্গেট করে করতে চাই না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন