সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, জাল ভারতীয় রুপি তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে জাল রুপি তৈরির সরঞ্জাম ও বিভিন্ন উপকরণ৷ এক দিকে জাল নোট ছাপানো ও কাটার কাজ চলছে। সেখানেই বসে রয়েছেন বাড়ির মালিক শহিদুল ইসলাম। শ্রমিকদের সাথে গল্প, আড্ডা ও দিক নির্দেশনা দিতে দেখা যাচ্ছে শহিদুল ইসলামকে। সিসিটিভি ফুটেজটি দেখার পর জাল নোট তৈরির সময় ধারনকৃত ফুটেজে নিজের থাকার কথা স্বীকারও করেছেন তিনি।
যেখানে জাল নোট তৈরির সময় থাকার কথা স্বীকার করেছেন শহিদুল ইসলাম নিজেই, সেখানে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটলিয়ন-র্যাবের অভিযানে বিপুল পরিমাণ জাল ভারতীয় রুপি জব্দের পর হওয়া মামলায় নেই তার নাম। মামলার প্রধান আসামী করা হয়েছে সেই বাড়ির এক ভাড়াটিয়া মো.খান সাহেবকে। অভিযানে আটক দুজনসহ মামলায় তিনজন আসামী হলেও অজ্ঞাত কারনে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে মূলহোতা শহিদুল ইসলামকে।
জানা যায়, গত ০৮ আগস্ট রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের বালুবাগান মহল্লার মো. মনিরুল ইসলামের ছেলে মো. শহিদুল ইসলামের বাড়িতে জাল নোট তৈরির মিনি কারখানায় অভিযান চালায় র্যাব (বর্তমানে এসআরবি)। অভিযানে উদ্ধার করা জাল টাকার পরিমাণ ৪৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যমানের ভারতীয় রুপি। এর মধ্যে ৫০০ রুপি মূল্যের ২৩টি বান্ডিল এবং ২০০ রুপি মূল্যের দুটি বান্ডিল ছিল। এছাড়া কারখানাটি থেকে ২ রিম বিশেষ বিদেশি জাল সুতা, ১ বস্তা বিশেষ ড্রাফটিং কাগজ, ১৮টি বিশেষ ধাতব ফরম বা ডাইস, ৫টি রাবার, ৫ কৌটা রঙের কেমিকেল, কেমিকেলভর্তি একটি ড্রাম, একটি ল্যাপটপ, একটি সিপিইউ, দুটি কালার প্রিন্টার এবং শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হিটার জব্দ করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বসতবাড়ির আড়ালে ফ্ল্যাটের ভেতরের কক্ষে ডিজিটাল ডিভাইস ও হিটার ব্যবহার করে দিনরাত জাল নোট ছাপানো হতো। সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় এখানে তৈরি জাল রুপিগুলো সহজেই বিভিন্ন চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে সীমান্ত পার করা বা সীমান্ত-বাণিজ্যে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। র্যাব অভিযানে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার চৌধুরীপাড়া গ্রামের তৌসিকুল ইসলাম তোসিফ (৩০) এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার মন্দিখোর গ্রামের শামীম আলী (৩২)-কে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
জাল নোট তৈরির ঘটনায় অভিযানের পর বাড়ির ভাড়াটিয়া ও পলাতক খান সাহেবসহ আটক দুই জন মিলে মোট তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করে র্যাব। বর্তমানে আদালতে চলমান থাকা মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ। সম্প্রতি জাল নোট তৈরির ওই ঘরের একটি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিওটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসের। প্রতিবেদকের হাতে আসা ভিডিও-তে দেখা যায়, বাড়ির মালিক শহিদুল ইসলামকে। প্রথমে অস্বীকার করলেও নিজের ভিডিও জাল নোট তৈরির ঘরে দেখতে পেয়ে স্বীকার করেন।
এবিষয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি জাল নোট তৈরির বাড়ির মালিক শহিদুল ইসলাম। তবে তিনি জানান, ভিডিওতে জাল নোট তৈরির সময় দেখা ব্যক্তি আমি নিজেই। তবে জাল নোট তৈরির সাথে আমার সম্পৃক্ততা নেই। কারন গত ০৮ আগস্ট র্যাবের অভিযানে আটকের এক-দেড় মাস আগে আমি আমার বাড়িতে এই অবৈধ জাল নোট তৈরির বিষয়টি জানতে পারি। জানার পরেই ভাড়াটিয়া খান সাহেবকে বাড়ি ছাড়তে বলি এবং টু-লেটের বিজ্ঞাপন দেয়। এর মাঝেও তিনি স্বীকার করে সঙ্গ দোসে ওই ঘরে যাওয়া।
জাল নোট তৈরির সাথে সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে বাড়ির মালিক শহিদুল ইসলাম আরো বলেন, ঘটনার সময় আমি শিবগঞ্জ উপজেলার খাসেরহাটে ছিলাম। যদিও তার তথ্য-প্রযুক্তির সহযোগিতায় জানা গেছে, বাড়ির আশেপাশেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় তার অবস্থান ছিল। তিনি বলেন, আমি যেহেতু সম্পৃক্ত নয়, তাই আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজে থাকা ভিডিও অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, জাল নোট ছাড়াও নিয়মিত মাদকের আসর বসতো সেই বাড়িতে। এবিষয়েও কিছুই জানি না বলে দাবি করেন শহিদুল ইসলাম।
এদিকে জাল নোট তৈরির মামলার প্রধান ও পলাতক আসামী মো. খান সাহেব জানান, জাল নোট তৈরি বা এ সংক্রান্ত কোন কার্যক্রমে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি বাড়ি ভাড়া নিয়ে শহরে নিয়মিত যাতায়াত করতাম। আমার সাথে বাড়ির মালিক শহিদুল ইসলামের একটি অর্থনৈতিক লেনদেন ছিল। আমি তার কাছে পাওনা টাকা চাওয়ার পর থেকেই আমার বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র শুরু হয়। হঠাৎ করেই বাড়ির দুই বছর ধরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকলেও গত ৩ মাস থেকে দুরত্ব তৈরি হয়। একটা রুম নিয়েই সেখানে থাকতাম। বাড়ির অন্য রুমে কি হতো তা জানা নেই। হঠাৎ করেই গত ০৮ আগস্ট আমি ওষুধ আনতে গেলে বাসা থেকে ফোন দিয়ে জানানো হয় বাড়িতে র্যাব অভিযান করছে এবং বিপুল পরিমান জাল ভারতীয় রুপি জব্দ করেছে। তবে আমাদের রুমে কোনকিছুই পায়নি র্যাব। তবুও আমার নামে মামলা দিয়েছে।
গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মো. খান সাহেব আরও বলেন, বিষয়টি তদন্তে গাফেলতি আছে। বাড়ির মালিক ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে র্যাবের সাথে হাত মিলিয়ে আমাকে ফাঁসিয়েছে। এর আগে কখনো বুঝতে পারিনি এই বাসায় এমন কর্মকান্ড হয়। আরো গভীর তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ করলে জাল নোট তৈরির মূলহোতা বেরিয়ে আসবে। বাড়ির মালিক শহিদুল নিজেই এর মূলহোতা হলেও আমার নামে দোষ চাপাচ্ছে। ২০ আগস্টের মধ্যেই বাড়ি ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে দাবি করেন ভাড়াটিয়া ও জাল নোট তৈরির মামলার আসামী খান সাহেব।
এবিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. সাকিল হোসেন জানান, ভিডিও-টি আমিও দেখেছি। তবে তা আরো নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে তদন্তকাজ চলমান রয়েছে। র্যাবের দায়ের করা মামলায় তিনজন আসামী থাকলে তদন্তে আরো কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে মামলায় আসামী হিসেবে যুক্ত করা হবে।
র্যাব-৫, (বর্তমানে এসআরবি) সিপিসি-১ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানী কমান্ডার তরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সময় আমি ছিলাম না। বিষয়টি আপনার (প্রতিবেদক) কাছেই শুনলাম। এনিয়ে খোঁজ-খবর নেয়া হবে।
পড়ুন : আক্কেলপুরে নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণ


