বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গ্রেফতার হচ্ছে, জামিনে ফিরছে: রাতের ঢাকায় অপরাধীদের দাপট

অপরাধীরা ধরা পড়ছে, মামলা হচ্ছে, আবার কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে ফিরছে একই অপরাধের মাঠে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক ছিনতাই, হামলা, ভাঙচুর, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে এমনই এক চক্রের চিত্র সামনে আসছে। বিশেষ করে রাত নামলেই বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ। প্রশ্ন উঠছে, নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পরও কেন থামছে না অপরাধের দাপট?

বিজ্ঞাপন

গত রোববার রাত সাড়ে ১০টা। রাজধানীর দোলাইরপাড় চৌরাস্তা থেকে পোস্তগোলা সেতু পর্যন্ত থমকে আছে যান চলাচল। এক্সপ্রেসওয়ের মুখে দীর্ঘ যানজট, আটকে আছে শত শত যানবাহন। ট্রাক, বাস, মিনিবাস, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের সারি যতদূর চোখ যায়।

অন্ধকারে রোড লাইটের আবছা আলোয় হঠাৎই দেখা গেল, একদল কিশোর-তরুণ এক্সপ্রেসওয়ের রোড ডিভাইডার টপকে দ্রুত নিচে নেমে আসছে। কারও হাতে ছোট রড, কারও হাতে ছুরি কিংবা চাকুসদৃশ অস্ত্র। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ছুটে যাচ্ছে একেকটি গাড়ির দিকে।

কেউ প্রাইভেটকারের দরজা টানছে, কেউ বনেটে থাবা দিচ্ছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের পেছনের ত্রিপল ও রশি কাটার চেষ্টা করছে কয়েকজন। আবার কেউ কেউ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেরাই ঝগড়া বাধানোর ভান করছে। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির ভেতরে থাকা যাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের চালকরা দ্রুত দরজা-জানালা লক করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ গাড়ির আলোও নিভিয়ে দিচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও ট্রাকচালকরা গ্লাস তুলে দরজা বন্ধ করে বসে থাকছেন। যেসব বাস ও ট্রাকে যাত্রীসংখ্যা বেশি, সেসব গাড়ির পুরুষ যাত্রীরা মোটা বেতের লাঠি হাতে গাড়ির সামনে অবস্থান নিচ্ছেন।

অন্যদিকে নারী ও শিশুসহ কমসংখ্যক যাত্রী থাকা গাড়িগুলোতে আতঙ্ক আরও তীব্র। অনেকে দরজা-জানালা বন্ধ করে দোয়া পড়তে শুরু করেন। সবার মনে তখন একটাই প্রশ্ন—‘জ্যাম ছাড়ছে না কেন?’

শুধু দোলাইরপাড় নয়, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতার এমন অভিযোগও বাড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, টানাপার্টি ও থাবাপার্টির তৎপরতার পাশাপাশি হামলা, ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগও সামনে আসছে। মোহাম্মদপুর-আদাবর, ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রোপার্টিজে হামলা-ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার অভিযোগ, মিরপুরের রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিং এলাকায় সংঘর্ষ ও দখলচেষ্টার অভিযোগ—এসব ঘটনায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত সোমবার রাতেও আদাবরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ গুলি চালালে রাজিব হাওলাদার (৩০) ও সাগর (২৪) নামে দু’জন আহত হন।

গ্রেফতার হচ্ছে, ফিরছে আবার

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজধানীতে বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন ও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু গ্রেফতার হওয়া অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ কারণে শুধু মাঠপর্যায়ের ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজ কিংবা কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অপরাধের পেছনে থাকা অর্থদাতা, আশ্রয়দাতা, সংগঠক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে একই চক্রের নতুন সদস্যরা আবারও মাঠে নামবে।

অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ চলমান থাকার মধ্যেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত এসব ঘটনায় নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে। কখন কার জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক কিংবা বাড়িতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা হয়—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে।

এই পরিস্থিতিতে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অভিযান চালানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

এ কঠোর অবস্থানে পুলিশ

এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির। গতকাল মঙ্গলবার সারা দেশের পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দলীয় পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী।

আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সাথে জড়িতদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।

চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকলে তা উদঘাটন করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশও দেন তিনি। পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে ছিনতাই, হামলা, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের পর আইজিপির এ নির্দেশকে মাঠপর্যায়ে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অভিযান ও গ্রেফতারই যথেষ্ট নয়—অপরাধের নেপথ্যের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো চিহ্নিত করা, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা এবং একই অপরাধে বারবার জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের পুনঃঅপরাধের কারণ চিহ্নিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

রাজধানীর রাতের রাজপথে যানজটে আটকে থাকা সাধারণ মানুষের প্রশ্ন তাই এখন একটাই—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শেষ হওয়ার পরও কেন একই জায়গায় আবার ফিরে আসছে অপরাধীরা?

সূত্র: নয়াদিগন্ত

পড়ুন: উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন