রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী পদ হারিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়া এবং আরও কয়েকটি অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হাফেজ মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি ২০২৫ সালের। কিছু অনিয়মের অভিযোগে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সালের স্বাক্ষর করা চলতি বছরের ৩১ জুলাইয়ের একটি চিঠিতে আম্মারের বিরুদ্ধে একাধিক সাংগঠনিক অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ‘নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, মেয়েদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন ও সম্পদের তসরুপ এবং সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পরিপন্থি কাজে জড়িত থাকার’ অভিযোগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় তার সাথীপদ মূলতবি করা হয়েছিল।
চিঠি অনুযায়ী, পরবর্তীতে অভিযোগগুলোর সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় একই বছরের সেপ্টেম্বরের মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় তার সাথীপদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, সালাউদ্দিন আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তার ‘উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ ক্যাম্পাসকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়।
এ অবস্থায় সংগঠনের নেতাকর্মীদের আম্মারের অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া না দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে রাকসুর নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের তার সঙ্গে শুধু দাপ্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি এবং বর্তমানে রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মুস্তাকুর রহমান জাহিদের স্বাক্ষর করা একটি চিঠিতেও আম্মারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে।
ওই চিঠিতে বলা হয়, সালাউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী মহানগর ও জেলা কমিটিতে অর্থের বিনিময়ে পদ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও রিপোর্টের মাধ্যমে বিষয়টি শাখা শিবিরের নজরে আসে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে নৈতিক পদস্খলনের আরও কয়েকটি অভিযোগ পাওয়ার কথাও বলা হয়।
চিঠি অনুযায়ী, এসব অভিযোগ নিয়ে ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত শাখা শিবিরের মাসিক সেক্রেটারিয়েট সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরে সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আম্মারের সাথীপদ মূলতবি করা হয়।
তবে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার।
২০২৫ সালের রাকসু নির্বাচনে শিবিরের ‘ডামি প্যানেল’ হিসেবে আলোচনায় আসা ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে জিএস নির্বাচিত হন আম্মার। ওই প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মেহেদী সজীব পরবর্তীতে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আম্মারের শিবিরের সাথীপদ বাতিলের তথ্য সামনে আসায় ‘ডামি প্যানেল’ নিয়ে আলোচনাও আবার সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে সালাউদ্দিন আম্মারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাবি শিবিরের কার্যক্রম ও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আম্মার।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে আম্মার লেখেন, রাবি শিবিরের একটা ভয়াবহ গুণ—তারা মিথ্যাকে সত্য বানায়, আর সত্যকে মিথ্যা।
নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অভিযোগ প্রসঙ্গে আম্মার দাবি করেন, ক্যাম্পাস জীবনে কোনো নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিনি এমন আচরণ করেননি, যা অন্য কোনো অর্থ বহন করে। তার ভাষ্য, তাকে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার অভিযোগে বহিষ্কার করা হলেও শিবিরের দায়িত্বশীলদের মধ্যেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের উদাহরণ রয়েছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়েও নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন আম্মার। তিনি বলেন, তাকে নিয়ে একসময় ৭৬ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হয়েছিল। তার দাবি, জুলাই আন্দোলন নিয়ে একটি কনসার্ট আয়োজনের জন্য তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অর্থসংকটের কথা জানিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক ও কোম্পানির কাছে প্রস্তাব নিয়ে যান। পরে সেই প্রস্তাবকে চাঁদা চাওয়ার চিঠি হিসেবে প্রচার করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
অর্থের বিনিময়ে পদবাণিজ্যের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন আম্মার। তিনি দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি ওই কমিটি এনে দিয়েছেন—এমন একটি ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শিবিরের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও অবস্থান জানান আম্মার। তিনি বলেন, ডানপন্থী সংস্কৃতিচর্চার কারণে তাকে শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। শিবিরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও তিনি অংশ নিয়েছেন বলে দাবি করেন।
আম্মার আরও দাবি করেন, রাবি শিবিরের শাখায় তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আনা হলেও কোনো অভিযোগের প্রমাণ দেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, তারা একাধিক অভিযোগ এনেছে, একটা প্রমাণ আনেনি। শুধু এলিগেশন।
নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে তিনি বলেন, আনিত অভিযোগগুলোর কোনোটার সাথেই সম্পৃক্ত না। এখন যেটা আমি করিনি, সেটার অভিযোগ যদি আমার বিরুদ্ধে দেন তো আমি প্রমাণ কীভাবে দিব?
এর আগে শিবিরের বিভিন্ন সময়ের তিনটি চিঠিতে আম্মারের সাথী পদ স্থগিত ও পরে বাতিলের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এসব চিঠিতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ, নৈতিক পদস্খলন, নারীদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। শিবিরের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এদিকে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া আরেক পোস্টে আম্মার শিবিরের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পদ বাণিজ্যের একটি প্রমাণ দেখানোর আহ্বান জানান। এ জন্য তিনি ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন।
পড়ুন : ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, পরিস্থিতি আরও খারাপের শঙ্কা
সা/


