রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের পাইকপাড়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পের একটি ভবনে লিফট ছিঁড়ে ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকাল ৬টার দিকে পাইকপাড়া আনসার ক্যাম্পের পশ্চিম পাশে অবস্থিত প্রকল্পটির ১ নম্বর ভবনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নেওয়া হয়েছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক কর্মচারী মোস্তাফিজুর রহমান (৬২), নাইস আহমেদ (৪০) এবং তার ছেলে মো. ওয়াসি (৮)। দুর্ঘটনায় নাইস আহমেদের দুই পা ভেঙে গেছে বলে জানা গেছে।
ভবনটির সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ফজরের নামাজের পর ভবনের পঞ্চম তলার ওই তিন বাসিন্দা লিফটে ওঠেন। কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দে লিফটটি ছিঁড়ে নিচে পড়ে যায়। পরে ভবনের দারোয়ান ঘটনাস্থলে গিয়ে লিফটের ভেতর থেকে তাদের চিৎকার শুনতে পান।
শাহাবুদ্দিন আহমেদ আরও জানান, আশপাশের কয়েকজন পরে ঘটনাস্থলে এসে লিফটের ভেতর থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধার করেন। এরপর তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মিরপুর মডেল থানার ডিউটি অফিসার মেহেদী হাসান।
ভবনের লিফট ছিঁড়ে পড়ার বা নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে প্রধানত নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অতিরিক্ত ওজন এবং যান্ত্রিক ত্রুটি দায়ী।
লিফট ছিঁড়ে বা নিষ্ক্রিয় হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
- নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: দীর্ঘদিন লিফটের কেবল, পুলি ও ব্রেক পরীক্ষা ও ঠিকঠাক না করলে এগুলো দুর্বল হয়ে যায়। বিস্তারিত জানতে চলনবিল প্রবাহ এর প্রতিবেদন পড়তে পারেন।
- তার বা কেবল ক্ষয় হওয়া: লিফট ওঠানামার প্রধান মাধ্যম বা টেনশন কেবল অতিরিক্ত ব্যবহারে বা বয়সের ভারে ক্ষয়ে গেলে ছিঁড়ে যেতে পারে।
- অতিরিক্ত ওজন (ওভারলোডিং): নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বা মালামাল ওঠালে লিফটের কেবল ও মোটরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
- যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক ত্রুটি: লিফটের গিয়ার, ব্রেকিং সিস্টেম বা কন্ট্রোল প্যানেলে ত্রুটি থাকলে লিফট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে।
- নিম্নমানের যন্ত্রপাতি: লিফট ইনস্টল করার সময় যদি কমদামী বা নিম্নমানের কেবল ও পার্টস ব্যবহার করা হয়, তবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
- সেফটি ডিভাইসের অকার্যকারিতা: লিফটের নিজস্ব ইমারজেন্সি ব্রেক বা গভর্নর সিস্টেম নষ্ট থাকলে তার ছিঁড়লে লিফটকে আটকে রাখতে পারে না।
লিফট ফ্রি-ফল হলে করণীয়
১. মেঝেতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
- কী করবেন: লিফটের মেঝেতে পিঠ ঠেকিয়ে সোজা চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন। আপনার হাত দিয়ে মুখ ও মাথা ঢেকে রাখুন, যাতে কোনো ধ্বংসাবশেষ এসে মাথায় না পড়ে।
- কেন করবেন: আপনি যখন শুয়ে পড়েন, তখন লিফটের আছড়ে পড়ার তীব্র আঘাতের বল (Impact force) একক কোনো অঙ্গে আঘাত না করে আপনার পুরো শরীরে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে মেরুদণ্ড, হাঁটু বা শরীরের প্রধান হাড়গুলো সরাসরি ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।
২. জায়গা না থাকলে মেঝেতে বসে পড়ুন
- কী করবেন: লিফটে যদি অন্য যাত্রী থাকে এবং শোয়ার জায়গা না মেলে, তবে দ্রুত মেঝেতে বসে পড়ুন। এরপর আপনার মাথাটি দুই হাঁটুর মাঝখানে এনে হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে রাখুন।
- কেন করবেন: এটি অন্তত আপনার মাথা ও ঘাড়কে বড় ধরনের ঝাঁকুনি ও ইনজুরি থেকে সুরক্ষিত রাখবে।
৩. যা কখনোই করবেন না
- লাফানোর চেষ্টা করবেন না: অনেকের ধারণা, লিফট মাটিতে আছড়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে লাফ দিলে বাঁচা যাবে। এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। ফ্রি-ফলের সময় আপনি কখন মাটিতে আঘাত করবেন তা জানা অসম্ভব। উল্টো লাফ দিলে লিফটের ছাদে মাথা লেগে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
- সোজা দাঁড়িয়ে থাকবেন না: সোজা দাঁড়িয়ে থাকলে লিফটের পুরো ইমপ্যাক্ট আপনার পা এবং মেরুদণ্ডের ওপর আসবে, যা শরীরের ভেতরের প্রধান অঙ্গগুলোকে চূর্ণ করে দিতে পারে।
দুর্ঘটনা পরবর্তী জরুরি চেকলিস্ট
যদি লিফট আছড়ে পড়ার পর আপনি জীবিত এবং সচেতন থাকেন, তবে দ্রুত এই পদক্ষেপগুলো নিন:
- শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখুন: আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন, কারণ আতঙ্ক অতিরিক্ত অক্সিজেন খরচ করে।
- ফোনের সিগন্যাল চেক করুন: যদি ফোনের নেটওয়ার্ক পান, তবে সরাসরি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল দিন।
- ইমারজেন্সি অ্যালার্ম চাপুন: লিফটের কন্ট্রোল প্যানেলে থাকা অ্যালার্ম বা কল বাটনটি বারবার চাপতে থাকুন।
- উদ্ধারকারীদের সংকেত দিন: আপনার কাছে কোনো শক্ত বস্তু বা চাবি থাকলে তা দিয়ে লিফটের দেয়ালে আঘাত করে আওয়াজ করুন, যাতে বাইরে থাকা মানুষ বা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আপনার অবস্থান বুঝতে পারে।
পড়ুন : সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ৪ গুদাম সিলগালা
সা/


