ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৭৪টি বিমান হামলা ও নির্ভুল সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। এসব অভিযানে ১ হাজার ৫৪০ জন হুথি যোদ্ধা নিহত বা আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
ইয়েমেনি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, হুথিদের অবস্থান, সামরিক গতিবিধি, রসদ সরবরাহ এবং সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে এসব অভিযান চালানো হয়। অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, গোলন্দাজ ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে।
মুখপাত্রের দাবি, এসব অভিযানের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র লড়াই হয়েছে তাইজ ফ্রন্টে। ওই এলাকাতেই বেশিরভাগ হুথি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
ইয়েমেনি বাহিনী আরও দাবি করেছে, অভিযানে হুথিদের ২১৬টি সামরিক যান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি জোট রাজধানী সানা, সাদা, তাইজ, হাজ্জাহ ও আমরান এলাকা থেকে শুরু করে কিতাফ, আল-জাওফ, মারিব, আল-বাইদা, লাহজ ও সাদাসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব অভিযান পরিচালনা করেছে।
তবে সৌদি বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলেছে ইয়েমেনের হুথিরা। তাদের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় সানা, সাদা, তাইজ, হাজ্জাহ, আমরান ও ইব প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় সৌদি বাহিনী ৯৪টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
হুথিদের দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল বেসামরিক স্থাপনা। এতে বেশ কয়েকজন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। হামলায় এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।
এদিকে হুথিদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর পর থেকে সৌদি বাহিনী অন্তত ১ হাজার ৩৫০ বার হামলা চালিয়েছে।
ক্ষমতা দখল, আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার এবং লোহিত সাগরের কৌশলগত জলপথ নিয়ন্ত্রণের লড়াইকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সংঘাতে দেশটি চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ইয়েমেনি বাহিনী ও সৌদি জোটের বিরুদ্ধে হুথি বিদ্রোহীদের সংঘাত এবং তাইজসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র লড়াইয়ের ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
এর আগে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তুর আল-বাহাহ বাহিনী জানায়, সব ফ্রন্টে হুথিদের হামলা ঠেকানোর পাশাপাশি হামলার জন্য জড়ো করা সরঞ্জামও ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি তারা।
এর আগে সকালে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী জানায়, দক্ষিণ-পূর্ব তাইজের হাইফান জেলা ও আল-আকবুস এলাকায় ছয়টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় হুথি যোদ্ধাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে তারা।
গত এক মাস ধরে হুথিদের সঙ্গে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এর মধ্যে হুথিরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তাদের অগ্রযাত্রা থমকে গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এদিকে সৌদি আরবও হুথিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এর আগে বলেছেন, দেশের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি হুথিদের ইয়েমেন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
হুথিদের বিরুদ্ধে বড় হামলার প্রস্তুতি সৌদি আরবের
ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। এ হামলার পরিকল্পনা নিয়ে বর্তমানে কাজ করছে রিয়াদ।
মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক সূত্র বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন এই অভিযান শুরু হতে পারে। হুথিদের লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়াই হবে এর অন্যতম লক্ষ্য। একই সময়ে ইয়েমেনের সব ফ্রন্টে হামলা চালানোর পরিকল্পনাও থাকতে পারে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভিযানে ইয়েমেনের স্থল বাহিনী নেতৃত্ব দেবে। এই বাহিনী সৌদি আরব পরিচালনা করে। অন্যদিকে বিমান হামলা চালাবে সৌদি বাহিনী।
আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, সৌদি আরবকে ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি কয়েকটি আরব ও ইউরোপীয় দেশ সৌদিকে রক্ষণাত্মক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য এই অভিযানে সৌদির কোনো মিত্র সরাসরি অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
ইয়েমেনে ২০১৪ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় হুথিরা রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন এলাকা দখল করে নেয়। এর পরই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনি সরকারকে সহায়তা করতে ২০১৫ সালে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব। সে সময় হুথিদের লক্ষ্য করে হাজার হাজার বিমান হামলা চালালেও তাদের সরিয়ে দিতে পারেনি সৌদি বাহিনী।
পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ওই যুদ্ধবিরতি টিকে ছিল।
প্রায় দুই মাস আগে সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালায় সৌদি বাহিনী। ওই সময় ইরান থেকে ফেরত আসা হুথি নেতাদের বহনকারী একটি বিমান সেখানে অবতরণ করছিল। ঘটনার পর সৌদির ওপর ক্ষুব্ধ হয় হুথিরা। এরপর তারা সৌদিতে হামলা চালানোর পাশাপাশি তাদের ওপর আরোপ করা অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানাতে থাকে।
অবরোধ প্রত্যাহার না করলে লোহিত সাগর ও বাব এল মান্দেব দিয়ে সৌদি আরবের কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেয় হুথিরা। এর পর তারা সৌদির জাহাজে হামলা চালায়।
এরই মধ্যে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলে নেয় হুথিরা। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন আগে দ্রুত অভিযান চালিয়ে লোহিত সাগরের যেসব এলাকা হুথিরা দখল করেছে, সৌদির সম্ভাব্য নতুন অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হবে সেসব এলাকা থেকে হুথি যোদ্ধাদের সরিয়ে দেওয়া।
সূত্র: রয়টার্স
পড়ুন : মুক্তাদিরের শ্বশুরের মদের বার ছাড়াও আছে সম্পদের পাহাড়!
সা/


