বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এবং আর্থিক সংকটে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া শিশুদের আবারও প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘আনন্দ স্কুল’ প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর মূল্যায়নে উঠে এসেছে অনিয়ম, আর্থিক অসংগতি, উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার চিত্র। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
প্রকল্পের আওতায় প্রকৃত বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও কোনো কোনো আনন্দ স্কুলের তালিকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নাম পাওয়া গেছে। অন্যদিকে প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ না থাকলেও প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ সফর করেছেন ১১৬ কর্মকর্তা। এ ছাড়া প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে ঋণ দেওয়া, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি এবং অনুমোদিত চুক্তির অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের মতো আর্থিক অনিয়মের তথ্যও উঠে এসেছে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।
‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন, প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে আইএমইডি। গত এপ্রিল মাসে সরেজমিন পরিদর্শন, প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনা এবং ২০ জেলার ৬০ উপজেলার সুবিধাভোগীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে হাউস অব কনসালট্যান্টস প্রাইভেট লিমিটেড (এইচসিএল) আইএমইডির পক্ষে কাজ করেছে।
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কার্যক্রম ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে তিন দফা সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পর ২০২১ সালে এর বাস্তবায়ন শেষ হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকায়। প্রকল্পের মোট অর্থের প্রায় পুরোটাই এসেছে বিদেশি ঋণ থেকে। বিশ্বব্যাংক ঋণ দিয়েছে ১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫৮ কোটি টাকা।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সমাপ্তি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প সমাপ্তির প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা না দেওয়াকে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি।
প্রতিবেদনের মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ার ইশরাত বলেন, ‘বিষয়টি তাঁর জানা নেই। আইএমইডির প্রতিবেদন তিনি দেখেননি।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি ব্যাধির পর্যায়ে চলে গেছে। এ খাত নিয়ে লুটপাটকে বাণিজ্যের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শিশুদের স্কুলে ফেরানোর প্রকল্পটি এর বড় উদাহরণ। অভাব-অনটনে থাকা দরিদ্র পরিবারের শিক্ষাবঞ্চিত শিশু ও দরিদ্র বয়স্করা প্রকল্পটি থেকে সুবিধা পায়নি। ভোগবিলাস ও বিদেশ ভ্রমণে প্রকল্পটি ভোগ করেছে একটি অসাধু চক্র।
অনানুষ্ঠানিক পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাশেদা কে. চৌধুরী। তিনি বলেন, সরকারের উচিত এই প্রতিবেদনকে ভিত্তি ধরে তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা, পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের আবারও প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা। বিশেষ করে শহরের বস্তি, দুর্গম এলাকা ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিশুদের জন্য নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ‘আনন্দ স্কুল’ বা শিখন কেন্দ্রের মাধ্যমে তাদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে বাস্তবায়ন শেষে দেখা গেছে, নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী সব শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা যায়নি। গ্রামীণ এলাকায় সাত লাখ ২০ হাজার শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও প্রকল্পভুক্ত হয়েছে ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৫৫৬ শিশু। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩২ হাজার ৪৪৪ শিশু প্রকল্পের বাইরে থেকে গেছে।
গ্রামে ২১ হাজার ৬৩২টি শিখন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে চালু করা হয়েছে ২০ হাজার ২৩৯টি। অর্থাৎ, এক হাজার ৩৯৩টি কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য নির্ধারিত এক হাজার ৫০০ শিখন কেন্দ্রের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে এক হাজার ৩৩১টি। এ ক্ষেত্রে এক লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে সুযোগ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৪০০ জন।
শুধু শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্তি বা শিখন কেন্দ্র স্থাপনেই নয়, বিদ্যালয় সংস্কার ও শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ ব্যর্থতার পেছনে দুর্বল তদারকি, পাইলট প্রকল্প ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছে মূল্যায়ন প্রতিবেদন। এ ছাড়া প্রকল্পের পুরো মেয়াদে পাঁচজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের কারণেও বাস্তবায়ন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর। প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) এমন সফরের উল্লেখ না থাকলেও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে বিদেশ গেছেন ১১৬ কর্মকর্তা। প্রত্যেকেই সেখানে ১০ দিন করে অবস্থান করেছেন। কিন্তু এসব সফর কতটা প্রয়োজনীয় ছিল, প্রশিক্ষণ কতটা পরিকল্পিত ও প্রকল্পের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য কর্মকর্তা নির্বাচনের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট নয়। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে কর্মকর্তারা কীভাবে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষে তার প্রয়োগ কতটা হয়েছে কিংবা প্রশিক্ষণ-পরবর্তী দক্ষতা মূল্যায়ন ও অনুসরণের কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, সে বিষয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিতে পারেনি। ফলে বিদেশ সফরের প্রকৃত সুফল বা গুণগত ফলাফল নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা এবং ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা। কিন্তু কোনো কোনো আনন্দ স্কুলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বয়সসীমা ও ভর্তি নীতিমালা অনুসরণ না করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এসব কারণে প্রকল্পের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্তির কার্যকারিতা দুর্বল হয়েছে। দরিদ্র ও শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রকল্পটি প্রাসঙ্গিক হলেও বাস্তবায়নের সময় উপকারভোগী যাচাইয়ের পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল না। প্রকল্পের আওতায় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি বা আর্থিক সহায়তার গড় পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৪২৬ টাকা। মোট শিক্ষার্থীর ৮৮ দশমিক ৪২ শতাংশ নিয়মিত উপবৃত্তি পেয়েছে।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার প্রকল্পে আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। বিভিন্ন অর্থবছরে আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি এবং অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থ থেকে অন্য একটি প্রকল্পে এক কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। অথচ অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার বা অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগ নেই। এ ছাড়া ব্যাংক সুদ বাবদ অর্জিত ৫০ লাখ টাকা সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে সোনালী ব্যাংকের পরিবর্তে কর্মচারীর মাধ্যমে ভ্যাট কর্তনের কারণে এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মনিটরিং কর্মকর্তাদের চুক্তিতে নির্ধারিত পরিমাণের অতিরিক্ত বেতন দেওয়ায় ১৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। পরবর্তী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আউটসোর্সিং কর্মীদের চুক্তির অতিরিক্ত বেতন দেওয়ার কারণে আরও পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ভ্রমণ ভাতা বাবদ তিন লাখ টাকা কাল্পনিক ব্যয় দেখানো এবং প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে ক্রয় পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা অপচয়ের বিষয়ে অডিট আপত্তি রয়েছে। এসব আর্থিক অনিয়ম প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর আইএমইডি ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে। সংস্থাটির মতে, বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার কার্যক্রমকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে না রেখে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে ‘দ্বিতীয় সুযোগ শিক্ষা কর্মসূচি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে শনাক্ত ও কার্যক্রমের অগ্রগতি যাচাইয়ের জন্য পরিচয়পত্রভিত্তিক শিক্ষার্থী তথ্যভান্ডার তৈরির সুপারিশও করেছে আইএমইডি। পাশাপাশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নির্বাচন এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের শুরু থেকেই নিয়মিত শিখন মূল্যায়নের মাধ্যমে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এতে ভবিষ্যতে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করা, শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের অর্থের কার্যকর ব্যবহার মূল্যায়ন করা সহজ হবে বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র: সমকাল
পড়ুন: বাড়ছে বেকারত্ব, যুবকরা জড়াচ্ছে মাদক-জুয়া-চাঁদাবাজিতে, ভবিষ্যৎ কোথায়?
আর/


