ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে মাঠের বাইরের নানা আলোচনা ও বিতর্কের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বিরতিতে দারুণ সময় কাটিয়েছে পর্তুগাল। উয়েফা নেশনস লিগে টানা চার ম্যাচ জিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে দলটি। তবে এই চার ম্যাচের মধ্যে রোনালদো খেলেছেন মাত্র ৬৫ মিনিট। তাকে ঘিরে যখন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, তখনই জাতীয় দলের দরজা খোলা রাখার বার্তা দিয়েছেন পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুস।
ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচ শেষ হওয়ার প্রায় আধঘণ্টা আগে রোনালদোকে মাঠ থেকে তুলে নেন জেসুস। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে তাকে পুরো সময় বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়। ডেনমার্কের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচেও শুরুর একাদশে থাকবেন না—এমন খবর পাওয়ার পর কোপেনহেগেনে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো। এরপর থেকেই তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
অনেকের ধারণা ছিল, জাতীয় দলের হয়ে রোনালদোর অধ্যায় হয়তো শেষের দিকে পৌঁছে গেছে। তবে পর্তুগাল কোচ জেসুস স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রোনালদো চাইলে আবারও জাতীয় দলে ফিরতে পারবেন। তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও রোনালদোর ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন কোচ।
পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচ খেলে ১৪৬ গোল করা রোনালদোকে নিয়ে জেসুস বলেন, ‘সে যদি চায়, তবে জাতীয় দলে ফিরবে।’ একই সঙ্গে আল-নাসরেও রোনালদোর কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জেসুস বলেন, পরবর্তী দল ঘোষণার আগে তাদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। তবে শেষ সিদ্ধান্ত রোনালদোকেই নিতে হবে।
জেসুসের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বয়স ৪১ হলেও জাতীয় দলের পরিকল্পনায় রোনালদোর জন্য এখনো জায়গা রয়েছে। মাঠে তার ভূমিকা আগের মতো না থাকলেও দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে তাকে বিবেচনা করছেন কোচ।
ডেনমার্ক ও নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনগুলোতেও বারবার রোনালদোকে নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল জেসুসকে। তবে তিনি বারবার জানিয়েছিলেন, ম্যাচ শেষে এ বিষয়ে কথা বলবেন। নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ের পর অবশেষে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন তিনি।
পর্তুগাল কোচ বলেন, জাতীয় দলে ক্রিশ্চিয়ানোর অধ্যায় তার নিজের মতো করেই শেষ করার সুযোগ পাওয়া উচিত। তিনি কীভাবে শেষ করতে চান, সেই সিদ্ধান্তও তার নিজের হওয়া উচিত।
জেসুস আরও জানান, পর্তুগালের দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই তিনি রোনালদোর সঙ্গে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। তার ভাষায়, প্রথম দল ঘোষণার সময় তিনি রোনালদোকে বলেছিলেন, ‘আমার তোমাকে প্রয়োজন, তুমি খেলো বা না খেলো, তোমাকে আমার পাশে চাই, আমার তোমাকে দরকার।’ এখনো তার অবস্থান একই রয়েছে বলে জানান কোচ।
এতে বোঝা যাচ্ছে, রোনালদো নিয়মিত একাদশে থাকবেন কি না, সেটি আলাদা বিষয় হলেও দলের সঙ্গে তার উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন জেসুস। বিশেষ করে বড় ম্যাচ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় রোনালদোর অভিজ্ঞতা পর্তুগালের জন্য মূল্যবান হতে পারে বলে মনে করছেন কোচ।
রোনালদোকে ঘিরে যখন আলোচনা চলছে, তখন তার অনুপস্থিতিতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন গনসালো রামোস। তিনি তিনটি ম্যাচে শুরু থেকে খেলেছেন এবং প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছেন। এসি মিলানের এই স্ট্রাইকার বর্তমানে দারুণ ফর্মে রয়েছেন।
রামোসের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স পর্তুগাল কোচের সামনে আক্রমণভাগে নতুন কিছু বিকল্পও তৈরি করেছে। ফলে রোনালদোর বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে তাকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত আরও কৌশলগত হতে পারে।
তবে রোনালদোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও রেকর্ডের কারণে তার সঙ্গে অন্যদের তুলনা করা সহজ নয়। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোলের বিশ্ব রেকর্ডধারী এই ফরোয়ার্ড এখনো দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম।
রোনালদোকে ঘিরে আলোচনার মধ্যেও সতীর্থরা তার প্রতি সম্মান ও সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ের ম্যাচে গোল করা জোয়াও কানসেলো বলেছেন, রোনালদো তাদের অধিনায়ক এবং পর্তুগালের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়।
কানসেলোর মতে, রোনালদোকে ঘিরে সবকিছু শেষ পর্যন্ত ভালোভাবেই শেষ হবে। তবে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পর্তুগাল টানা চারটি জয় পেয়েছে।
আরেক সতীর্থ নুনো মেন্দেসও রোনালদোর জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জাতীয় দলে যে খেলোয়াড়ই আসুক, তাকে স্বাগত জানানো হবে। রোনালদো যদি ফেরেন, তাকেও তারা সাদরে গ্রহণ করবেন।
সতীর্থদের এমন বক্তব্যে বোঝা যায়, রোনালদোর সঙ্গে দলের সম্পর্ক এখনো ইতিবাচক। ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে নানা আলোচনা হলেও দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে বড় কোনো বিভাজনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
পর্তুগালের পরবর্তী ম্যাচ আগামী ১৪ নভেম্বর। ডেনমার্কের বিপক্ষে সেই ম্যাচের আগে নতুন দল ঘোষণা করবেন জেসুস। তার আগে রোনালদোর সঙ্গে কোচের আলোচনাই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রোনালদো নিজে জাতীয় দলের হয়ে আরও খেলতে চান কি না, নাকি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করার সিদ্ধান্ত নেবেন—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। জেসুস অবশ্য সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি তার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। কোচের বক্তব্য অনুযায়ী, রোনালদো চাইলে জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ পাবেন।
৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কেমন হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় পরিষ্কার—পর্তুগাল তার জন্য দরজা বন্ধ করেনি। বরং জেসুসের নেতৃত্বে দলটি মাঠে রোনালদোকে ছাড়াও জয়ের ধারায় রয়েছে, আবার একই সঙ্গে তার মতো অভিজ্ঞ একজন খেলোয়াড়কে প্রয়োজন হলে ফিরে আসার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
তাই আগামী নভেম্বরের দল ঘোষণার আগে রোনালদোর সিদ্ধান্তই হয়ে উঠতে পারে পর্তুগাল ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। তিনি ফিরলে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার সমন্বয় কীভাবে করা হবে, সেটিও হবে জেসুসের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর যদি রোনালদো বিদায়ের সিদ্ধান্ত নেন, তবে পর্তুগালের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষটিও হতে পারে বড় এক পরিবর্তনের সূচনা।
পড়ুন:মেসিকে বিদায়ের আগে বুরকিনা ফাসোকে ৭-০ গোল দিল আর্জেন্টিনা
ইমি/


