গোপনে কতটা সংগঠিত আওয়ামী লীগ?

রাজনীতির মাঠে কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে বেশি শব্দ করে। মঞ্চ নেই। মাইক নেই। প্রকাশ্য কার্যালয়ে আগের সেই ভিড় নেই। বড় বড় মিছিল কিংবা জনসমাবেশও নেই। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে -আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মাঠ এখন প্রায় ফাঁকা।

কিন্তু রাজনীতি কি শুধু মাঠে হয়? নাকি মাঠের বাইরে, পরিচিত মানুষের ফোনে, পুরোনো ওয়ার্ডের যোগাযোগে, সাবেক জনপ্রতিনিধির অনুসারীদের মধ্যে কিংবা ছোট ছোট ব্যক্তিগত বলয়ে এখনো টিকে আছে পুরোনো কোনো সাংগঠনিক সুতো?

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। প্রকাশ্য কর্মসূচির পথও কার্যত বন্ধ। তাই দলটি যদি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখেও থাকে, তার বড় অংশই দৃশ্যমান হওয়ার কথা নয়। আর সেখানেই জন্ম নেয় প্রশ্ন আওয়ামী লীগ কি হারিয়ে যাচ্ছে, নাকি শুধু চোখের আড়ালে যাচ্ছে?

একটি রাজনৈতিক দল বহু বছর ক্ষমতায় থাকলে তার সংগঠন শুধু কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা, ব্যবসায়ী বলয়, সাবেক জনপ্রতিনিধি, ছাত্র-যুব সংগঠন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের হাজারো স্তরে। ফলে সরকার পড়ে গেলেই সেই নেটওয়ার্ক একদিনে উধাও হয়ে যায় না।

কিন্তু আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত নেটওয়ার্ক নয় -নেতৃত্ব। প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে দলটির কেন্দ্রবিন্দু শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সাল থেকে তিনিই আওয়ামী লীগের সভাপতি। বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একজন নেতাকে ঘিরে এত দীর্ঘ সময়ের সাংগঠনিক নির্ভরতা বিরল।

এখন সেই শক্তিই হয়তো হয়ে উঠেছে দলটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। পুথিপত্র অনুযায়ী শেখ হাসিনার বয়স এখন ৭৯। আদতে সেটা আর একটু বেশিও হতে পারে। দেশে ফিরলে তাঁর সামনে শুধু রাজনীতি নয়, অপেক্ষা করছে দীর্ঘ আইনি লড়াইও। তার বিরুদ্ধে সারা দেশে অন্তত ৬৬৩টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার বিচার কত বছর চলবে, সেটি এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট -হাসিনার আগামী সময়ের বড় অংশ রাজনীতির মাঠের পাশাপাশি আদালতের লড়াইয়েও আটকে যেতে পারে।

ধরা যাক, এই আইনি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বহু বছর স্থায়ী হলো। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় – ৮০ পেরোনো একজন নেতাকে কেন্দ্র করে কি আবার পুরোনো দাপটে ফিরতে পারবে আওয়ামী লীগ? আর এখানেই আসে আরও কঠিন প্রশ্ন -হাসিনার পরে কে?

সম্প্রতি শেখ হাসিনা তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে দল পরিচালনার কথা বলেছেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও দলটির একাংশের মধ্যে অসন্তোষের খবর এসেছে। অর্থাৎ উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি এখনো মীমাংসিত নয়।

চার দশকের বেশি সময় ধরে যে তৃণমূল একটি নামকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করেছে, তারা নতুন কাউকে একইভাবে গ্রহণ করবে -তার নিশ্চয়তা কোথায়?

আবার পরিবার থেকে কেউ এলে প্রশ্ন উঠবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে। বাইরে থেকে কেউ এলে উঠবে উত্তরাধিকারের বৈধতা নিয়ে। তাই আওয়ামী লীগ গোপনে কতটা সংগঠিত – তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এমন অনেক প্রশ্নর মধ্যে আরও রয়েছে – সংগঠিত হয়ে তারা কার পেছনে দাঁড়াবে? পুরোনো নেটওয়ার্ক হয়তো কিছুদিন টিকে থাকতে পারে। স্মৃতি টিকে থাকতে পারে। সমর্থকও থেকে যেতে পারেন। কিন্তু নেতৃত্বের উত্তরাধিকার তৈরি না হলে শুধু শিকড় দিয়ে একটি বিশাল রাজনৈতিক বৃক্ষ আবার আগের উচ্চতায় ওঠে না।

তাই আজই আওয়ামী লীগের অধ্যায় শেষ -এমন চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। তবে এটুকু বলা যায় – আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় লড়াই এখন সরকারের সঙ্গে নয়, সময়ের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : শিক্ষার আলো ছড়ানোর মানুষগুলোর ভিন্ন বাস্তবতা

দেখুন : https://www.youtube.com/watch?v=fhU-19XRyIc&t=12s

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন