৪৩ বছর ধরে মানুষের ঘরে খবর পৌঁছে দেওয়া আজাহার আলীর নিজের জীবনের খবর রাখে কে?

গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ধানঘড়ার মো. আজাহার আলী। বয়স ৬২ বছর। মাত্র ১৯ বছর বয়সে পত্রিকা বিক্রির পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ৪৩ বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ে অসংখ্য মানুষের হাতে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন প্রতিদিনের দেশ-বিদেশের খবর। অথচ তার নিজের জীবনের গল্পটিই যেন আজও রয়ে গেছে অন্তরালে।
​একসময় পত্রিকা বিক্রি করে ভালোই আয় হতো। কিন্তু সময়ের সাথে পাল্টে গেছে সবকিছু। মানুষের হাতে এখন স্মার্টফোন, মুহূর্তেই অনলাইনে পাওয়া যায় খবরের আপডেট। ফলে আগের মতো ছাপা পত্রিকার চাহিদা ও বিক্রি দুটোই কমেছে, কমেছে আজাহার আলীর দৈনিক আয়ও।
​তবুও থামেনি তার পথচলা। বয়সের ভার ও ক্লান্তিকে সঙ্গী করেও প্রতিদিন পায়ে হেঁটে পত্রিকা নিয়ে বের হন তিনি। এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় ঘুরে মানুষের হাতে তুলে দেন সংবাদপত্র। এই পেশার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু জীবিকার নয় এ যেন তার জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
​সম্প্রতি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোডবাজার পুলিশ লাইন এলাকায় তার সঙ্গে কথা হয়। দূর থেকে দেখা যায়, হাতে পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক বয়স্ক মানুষ। কৌতূহলবশত কাছে গিয়ে কথা বলতেই বেরিয়ে আসে তার দীর্ঘ সংগ্রামের হৃদয়বিদারক গল্প।
​কথার একপর্যায়ে আজাহার আলী তার জীবনের অনেক অপ্রাপ্তি, অভাব আর জমানো আক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। বয়স ৬২ পেরোলেও এখনো তার স্থায়ী কোনো আয়ের উৎস নেই। পত্রিকা বিক্রি করে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
​তবে তার চাওয়া বা প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তিনি চান মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা। এই সামান্য পুঁজি দিয়ে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে চান তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আর প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করতে চান না—এটাই তার একমাত্র স্বপ্ন।
​এই সামান্য সহায়তার আশায় তিনি ইতিমধ্যে অনেকের দ্বারে দ্বারেও ঘুরেছেন। কিন্তু এখনো তার সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কথা বলার শেষ পর্যায়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হয়, “চাচা, হতাশ হবেন না। সমাজে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ আপনার পাশে দাঁড়াবেন।”
​কথার ফাঁকে ফাঁকে তার দীর্ঘশ্বাস আর না-পাওয়ার বেদনা স্পষ্ট করে বলে দেয়, জীবনের এই সায়াহ্নে এসেও তিনি কতটা অনিশ্চয়তা ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
​আজাহার আলীর প্রয়োজন কোনো বড় দান বা অনুদান নয়; তিনি চান সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য একটি সুযোগ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি ছোট্ট মাধ্যম। সমাজের বিত্তবান, মানবিক ও সহৃদয় ব্যক্তিরা একটু এগিয়ে এলে ২০–৩০ হাজার টাকার এই সামান্য সহায়তাই হয়তো তার জীবনে বড় এক ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
​৪৩ বছর ধরে যিনি অন্যের ঘরে ঘরে প্রতিদিনের খবর পৌঁছে দিয়েছেন, আজ হয়তো সমাজের কোনো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া সহায়তায় তার নিজের জীবনেরও একটি দারুণ সুসংবাদের অপেক্ষা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন:বড়োদের আসন শুধু দর্শকের, বিশ্ব শিশু দিবসের পুরো মঞ্চ ছিল শিশুদেরই দখলে

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন