তিন বছর আগে ইসরাইলে হামাসের ভয়াবহ হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন সংঘাতের অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তার অভিঘাত এখনো কাটেনি। বরং দীর্ঘ যুদ্ধের পর গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তা, ধ্বংস ও ক্ষমতার শূন্যতার প্রতীকে। হামাসও তিন বছর আগের সেই শক্ত অবস্থানে নেই। একসময় গাজা শাসন করা সংগঠনটি এখন সামরিক কাঠামো হারিয়ে ছোট ছোট গেরিলা দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আনুষ্ঠানিক বেসামরিক প্রশাসনও বিলুপ্ত করেছে তারা।
আজ হামাসের ওই হামলার তিন বছর পূর্ণ হলো। হামলার বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ গাজা উপত্যকার সীমানাজুড়ে ইসরাইলি বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামাসের অবশিষ্ট সদস্যদের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কিন্তু নিরাপত্তার এই কঠোর প্রস্তুতির আড়ালে গাজার বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। প্রায় দুই দশক ধরে উপত্যকাটি নিয়ন্ত্রণ করা হামাস এখন আগের সেই অবস্থানে নেই।
টানা তিন বছরের যুদ্ধে সংগঠনটির সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ভেঙে পড়েছে হামাসের রাষ্ট্রসদৃশ প্রশাসনিক কাঠামো।
চলতি বছরের জুলাইয়ে গাজায় নিজেদের বেসামরিক প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে হামাস। নাগরিক সেবা পরিচালনা, কর আদায় কিংবা আঞ্চলিক সরকার হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যে আর নেই, কার্যত সেই বাস্তবতাই স্বীকার করে নেয় সংগঠনটি।
এরপর দোহায় নির্বাসিত অবস্থানে থাকা খলিল আল-হাইয়াকে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধান নির্বাচিত করা হয়। এমন এক সময়ে তিনি সংগঠনটির নেতৃত্বে আসেন, যখন হামাসকে সশস্ত্র শাসকের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ভূগর্ভস্থ গেরিলা সংগঠনের চরিত্র নিতে হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সামরিক শাখা আল কাসেম ব্রিগেড ছিল সুসংগঠিত একটি বাহিনী। তখন সংগঠনটির ৩০ থেকে ৪০ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা ছিল বলে ধারণা করা হয়। পাঁচটি আঞ্চলিক ব্রিগেড, ২৪টি ব্যাটালিয়ন এবং প্রায় ১৪০টি কোম্পানিতে বিভক্ত ছিল সেই বাহিনী।
শুধু জনবলেই নয়, অস্ত্র ও অবকাঠামোর দিক থেকেও হামাস তখন শক্তিশালী ছিল। দূরপাল্লার রকেট, ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির সক্ষমতা ছিল তাদের। পাশাপাশি গাজার মাটির নিচে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ সুরক্ষিত সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক, যা ‘গাজা মেট্রো’ নামে পরিচিত, সংগঠনটির অন্যতম বড় সামরিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতো।
তিন বছর পর সেই কাঠামোর বড় অংশ আর কার্যকর নেই। ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, হামাসের আনুষ্ঠানিক সামরিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে।
সুসংগঠিত ব্যাটালিয়ন কাঠামোও আর আগের মতো নেই। ভারী অস্ত্র, রকেট তৈরির কারখানা এবং প্রকাশ্য কমান্ড পোস্টের অধিকাংশ ধ্বংস বা দখল হয়েছে। গাজা উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ দখল, সীমানা-সংলগ্ন বাফার জোন অথবা নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ বরাবর নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে।
হামাসের এই দুর্বলতার পেছনে বড় কারণ তাদের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক হত্যার ঘটনা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তেহরানে নিহত হন হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর চেয়ারম্যান ইসমাইল হানিয়া। একই বছরের অক্টোবরে রাফায় ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত হন ৭ অক্টোবরের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও গাজায় হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার।
আল কাসেম ব্রিগেডের কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খান ইউনিসে ব্যাপক বিমান হামলায় নিহত হন। এরপর ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ভাই ও গাজায় সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মোহাম্মদ সিনওয়ারকে ২০২৫ সালের মে মাসে হত্যা করা হয়।
গাজা সিটি ব্রিগেডের কমান্ডার ইজ আল-দিন আল-হাদ্দাদও ২০২৬ সালের মে মাসে নিহত হন। একপর্যায়ে তিনি হামাসের সামগ্রিক সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় কাঠামো অকার্যকর হয়ে যাওয়ার পর হামাসের অবশিষ্ট সশস্ত্র সদস্যরা এখন বিকেন্দ্রীভূত ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সুড়ঙ্গের টিকে থাকা অংশ, শহরের ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে এসব দল নিজেদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
তিন থেকে পাঁচজন যোদ্ধার এসব ছোট দল মূলত কম প্রযুক্তিনির্ভর গেরিলা কৌশলের ওপর নির্ভর করছে। হাতে তৈরি বিস্ফোরক, স্বল্পপাল্লার স্নাইপার হামলা এবং ইসরাইলি টহল দলের ওপর অতর্কিত ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ হামলা এখন তাদের ব্যবহৃত কৌশলের অংশ।
ইয়াহিয়া সিনওয়ারের সময় হামাসের মূল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ছিল গাজার ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে। তার নেতৃত্বাধীন কট্টর সামরিক অংশ দোহায় থাকা রাজনৈতিক ব্যুরোর ওপর প্রভাব বিস্তার করত। যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই যুদ্ধবিরতির শর্ত ও কৌশল নির্ধারণ করা হতো।
সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর কয়েক মাস একটি অস্থায়ী কমিটির মাধ্যমে যৌথ নেতৃত্ব চলে। এরপর হামাসকে নির্বাসিত অবস্থান থেকে সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে হয়।
জুলাইয়ে শুরা কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর অভ্যন্তরীণ ভোটে খলিল আল-হাইয়া হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর পঞ্চম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ইসরাইলের একাধিক হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া এই প্রবীণ নেতা সংগঠনের ভেতরে বাস্তববাদী ও কঠোরপন্থি অবস্থানের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করছেন।
সশস্ত্র প্রতিরোধের আদর্শ ধরে রাখার পাশাপাশি আল-হাইয়া গাজার অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংসের বাস্তবতা উপলব্ধি করছেন। তার নেতৃত্বেই আনুষ্ঠানিক বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেয় হামাস।
শুরা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইসমাইল দারবিশ এবং পশ্চিম তীরের ব্যুরো প্রধান জাহের জাবারিনের সঙ্গে সমন্বয় করে আল-হাইয়ার বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, মিসর, কাতার ও তুরস্কের আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালানো এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনায় হামাসের অবস্থান ধরে রাখা।
তবে গাজায় হামাসের দীর্ঘ রাজনৈতিক উপস্থিতির অধ্যায়ও আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। ২০০৭ সালের জুনে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১৯ বছর গাজায় শুধু একটি সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে নয়, কার্যত একটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মতো কাজ করেছে হামাস।
সরকারি মন্ত্রণালয় পরিচালনা, কর আদায়, পুলিশ নিয়ন্ত্রণ, দেওয়ানি আদালত পরিচালনা এবং সরকারি স্কুল ব্যবস্থাপনার মতো দায়িত্বও পালন করেছে তারা। কিন্তু চলতি বছরের ৬ জুলাই সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। ওই দিন হামাস গাজায় নিজেদের বেসামরিক প্রশাসনিক কমিটি পুরোপুরি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়।
তবে প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়লেও গাজার দৈনন্দিন জীবন থেকে হামাসের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি। যেসব এলাকায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সীমিত, সেখানে সংগঠনটির গোপন ও ছায়া-নিরাপত্তা ইউনিটগুলো স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব ধরে রেখেছে।
মুখোশধারী সশস্ত্র ব্যক্তিদের এসব দল স্থানীয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, অপরাধী চক্র ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে। মানবিক সহায়তা বিতরণের পথ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করেছে এসব গোষ্ঠী।
তবে দীর্ঘ যুদ্ধ গাজার মানুষের হামাস সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এনেছে। ব্যাপক ধ্বংস ও বেসামরিক প্রাণহানির কারণে ইসরাইলবিরোধী ক্ষোভ এবং জাতীয়তাবাদী মনোভাব এখনো প্রবল। কিন্তু হামাসের একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতি মানুষের ধৈর্য কমেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ৬৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গাজার মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বর্তমানে ২ লাখ ৭৯ হাজারেরও বেশি মানুষ বন্যাপ্রবণ তাঁবু অথবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপে আশ্রয় নিয়েছেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটও অব্যাহত রয়েছে।
২০২৫ সালের শেষভাগ এবং চলতি বছর গাজার মধ্যাঞ্চল ও খান ইউনিসে বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা যায়। রাস্তায় নেমে মানুষ যুদ্ধ বন্ধ, বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ এবং প্রশাসন থেকে হামাসের সরে দাঁড়ানোর দাবি জানায়।
হামাস গ্রেপ্তার, বাড়িঘরে তল্লাশি ও কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে এসব বিক্ষোভের জবাব দেয়। এতে সাধারণ মানুষ ও সংগঠনটির টিকে থাকা কট্টর নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও গোত্রভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলোও ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগ নিতে শুরু করে।
উত্তর গাজা ও রাফার কিছু এলাকায় প্রভাবশালী পরিবারগুলো নিজেদের আত্মরক্ষামূলক মিলিশিয়া বা সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে। হামাসের ত্রাণবাহী ট্রাক দখল কিংবা অনানুষ্ঠানিক কর আরোপের চেষ্টাও তারা প্রতিহত করেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—হামাস কি আবার গাজার নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারবে?
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমত, ইসরাইল এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কঠোর বিরোধিতা। হামাস যেন গাজার ওপর সামরিক বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পায়, সেটিই ইসরাইলের প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম প্রধান অবস্থান।
হামাসের শাসনাধীন গাজায় আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন তহবিল আসার অনুমতি ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো আরব রাষ্ট্রগুলো দেবে না বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। অথচ গাজা পুনর্গঠনে ৮০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পুনর্গঠনের অর্থ পেতে হলে যে কোনো শাসকগোষ্ঠীর আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, গাজাকে ঘিরে প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ কাঠামো। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার আওতায় এই আন্তর্জাতিক শাসন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত এই কাঠামো গাজার অন্তর্বর্তীকালীন বেসামরিক প্রশাসনের তদারকি করবে।
পরিকল্পনায় অরাজনৈতিক ও টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি বেসামরিক কমিটির কথা বলা হয়েছে। নগর কার্যক্রম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্যানিটেশনের মতো বিষয়গুলো দেখবে এই কমিটি। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ও আরব শান্তিরক্ষী বাহিনীর সহায়তাও দেওয়ার কথা রয়েছে। এই কাঠামোয় হামাসের কোনো আসনের সুযোগ স্পষ্টভাবে রাখা হয়নি।
তৃতীয়ত, হামাসের নিজস্ব শাসন কাঠামোর ধ্বংস। একটি অঞ্চল পরিচালনার জন্য পুলিশ, মন্ত্রণালয়, তথ্যভান্ডার, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও কর আদায়ের মতো কার্যকর প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। কিন্তু যুদ্ধের সময় হামাসের প্রশাসনিক কাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে অব্যাহত নজরদারি ও সামরিক চাপের মধ্যে আগের মতো একক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন।
তবে হামাসের আনুষ্ঠানিক সরকার না থাকা মানেই তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, সংগঠনটি লেবাননে হিজবুল্লাহর শুরুর দিকের অবস্থান কিংবা আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির সময় তালেবানের কৌশলের মতো একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ গ্রহণ করতে পারে।
অর্থাৎ আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও গোপনে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং ভূগর্ভস্থ সশস্ত্র কাঠামো ধরে রাখা, পাশাপাশি ভয়ভীতি ও সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখা।
এদিকে যুদ্ধের তিন বছর পর গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে মিসরে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। মিসর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এতে মধ্যস্থতা করছেন। আলোচনার মূল লক্ষ্য গাজা শান্তি কাঠামোর দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন করা।
ইসরাইল গাজায় সক্রিয় রাষ্ট্র-বহির্ভূত সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ ও যাচাইযোগ্যভাবে নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়ে আসছে। এর মধ্যে মাটির নিচে থাকা অবশিষ্ট সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংসের বিষয়টিও রয়েছে।
অন্যদিকে খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন হামাস প্রতিনিধি দল অস্ত্র পুরোপুরি সমর্পণের দাবির বিরোধিতা করছে। এর পরিবর্তে তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে তাদের শর্ত হলো—একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতে অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে গাজা-মিসর সীমান্তে স্থায়ী বহুজাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
রামাল্লাহভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং ইসরাইলের রাজনৈতিক বাধার কারণে প্রস্তাবিত ‘টেকনোক্র্যাটিক ব্রিজ’ কাঠামোকেই নিকট ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রধান প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সামরিক, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক—তিন ক্ষেত্রেই বর্তমান সময়কে হামাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু হামাস দুর্বল হয়ে পড়লেই যে গাজার সংকটের অবসান হবে, তা নয়। বরং তাদের জায়গায় যদি কার্যকর, বৈধ এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাওয়া ফিলিস্তিনি নেতৃত্বাধীন কোনো প্রশাসন গড়ে উঠতে না পারে, তাহলে গাজা দীর্ঘস্থায়ী স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও ক্ষমতাধরদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আর সেই ক্ষমতার শূন্যতাই শেষ পর্যন্ত হামাসের অবশিষ্ট ভূগর্ভস্থ শক্তিকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে তখন আবারও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহের পথে হাঁটতে পারে সংগঠনটি।
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট
পড়ুন: অস্থির বিশ্বে শান্তির নোবেল, উঠবে কার হাতে?
আর/


