মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা নয়, ঘোষণা ট্রাম্পের

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হবে না বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে কোনো হামলা চালানো হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যখন মার্কিন নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে, তখন ট্রাম্পের এ ঘোষণা সামনে এল। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগও বেড়েছে।

সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার বিষয়ে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে। তবে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব গ্রহণ করেননি ট্রাম্প।

এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করা কিংবা মজুত ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি নয় তেহরান। এর আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা ‘অর্থবহ’ মাত্রায় কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা। তবে তেহরান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের বিষয়ে সাম্প্রতিক এক জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তোষ জানিয়েছেন। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি ট্রাম্প।

এদিকে ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিতে কয়েক দিন আগে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডকে নির্দেশনা দিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। তবে নির্দেশনায় হামলার নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

মার্কিন ও ইসরায়েলি সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে হামলা হতে পারে। এমনকি ইসরায়েলের নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগেও এ অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।

আগামী তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হলে তার প্রভাব পড়তে পারে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে। বিশেষ করে, সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক পদক্ষেপের বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তুত করে উপস্থাপন করাই প্রতিরক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, ট্রাম্পের সামনে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে এবং তিনি যেকোনো সময় সেগুলো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। তাঁর মতে, ইরানের অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় থাকায় ওয়াশিংটন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, ইরান ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সহজ কিংবা কঠিন—এই দুই পথের যেকোনো একটিতে সমস্যার সমাধান হবে। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতেই সব কার্ড রয়েছে এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে যা প্রয়োজন, তা-ই করবেন।

এর আগে গত বুধবার সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন ট্রাম্প।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের সদস্যরা যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের একপর্যায়ে ইরানে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে অ্যাক্সিওসকে জানিয়েছেন এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা।

বৈঠক শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, আলোচনায় ‘দীর্ঘমেয়াদি’ পররাষ্ট্রনীতি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন। ওই প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়ার দাবি রয়েছে।

ইরানে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়লেও নির্বাচনের আগে হামলার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা। অ্যাক্সিওসকে তিনি বলেন, ‘ইরানে আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। নির্বাচনের আগে হামলা চালানোর সম্ভাবনা খুব বেশি নেই, তবে আমরা তা উড়িয়ে দিচ্ছি না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।’

ইরান পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোনে কথা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ বিরতির পর কয়েক দিনের ব্যবধানে এটি তাঁদের দ্বিতীয় ফোনালাপ।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ‘৭ অক্টোবরের গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

অন্যদিকে, প্রথম ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে বৈঠকের পর নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এর আগে গত সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও কথা বলেছিলেন নেতানিয়াহু।

ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু হলে তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে অংশ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও অভিযানে যুক্ত হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার দাবি, ইরানের শাসকগোষ্ঠী বর্তমানে হতাশা ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতিতে ইরান আগেভাগেই হামলা চালিয়ে বসতে পারে।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আরও জানান, ইরান ইতিমধ্যে দুটি আকস্মিক হামলার মুখে পড়েছে। দেশটি তৃতীয়বারের মতো এমন হামলার শিকার হতে চায় না।

নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব ইসরায়েলের নির্বাচনেও পড়তে পারে। প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েল লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি কিংবা জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে নেতানিয়াহুকে ঘিরে বিরোধীদের সমালোচনা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পড়ুন : গাজায় বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলা, প্রাণ গেল ৭ ফিলিস্তিনির

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন