বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা শুরু হচ্ছে আজ শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে। পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনার এই দিনে চণ্ডীপাঠ, তর্পণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানাবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
মহালয়া শুধু দুর্গাপূজার সূচনাপর্ব নয়, প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের আত্মার শান্তি কামনারও বিশেষ তিথি। এদিন জল, তিল ও অন্ন উৎসর্গ করে তর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অনেকে।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষের শেষ এবং দেবীপক্ষের শুরুর সন্ধিক্ষণ হলো মহালয়া। পুরাণমতে, এই তিথিতেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করার দায়িত্ব পান এবং মর্ত্যে আগমনের প্রস্তুতি শুরু করেন। মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীর আগমনী বার্তা প্রচারিত হয়।
পুরাণে বর্ণিত আছে, মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্টি হয় মহামায়ার। দেবতাদের দেওয়া ১০টি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী দেবী দুর্গা মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। নয় দিনব্যাপী যুদ্ধের পর তিনি মহিষাসুরকে পরাজিত ও বধ করেন।
মহালয়া উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ভোর থেকেই বিভিন্ন স্থানে চণ্ডীপাঠ, চণ্ডীপূজা, বিশেষ পূজা ও মহালয়ার ঘট স্থাপনের কর্মসূচি পালিত হবে।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহালয়া উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন জানিয়েছেন, সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া শনিবার ভোরে রমনা কালী মন্দিরেও মহালয়া উদযাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মিন্টু বসু।
ঢাকায় অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে রয়েছে রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগের লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, রামসীতা মন্দির এবং জয়কালী মন্দির। এসব স্থানেও ভোর থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, এ বছর দেবী দুর্গার আগমন ঘটবে ঘোড়ায় (ঘোটক) চড়ে এবং বিদায় হবে নৌকায় চড়ে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, ‘এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে।’
আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী প্রধান উৎসব। তবে মহালয়ার মধ্য দিয়েই দুর্গাপূজার আগমনী আবহ ছড়িয়ে পড়বে দেশজুড়ে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এ বছর দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সাপ্তাহিক শুক্র ও শনিবারের ছুটির সঙ্গে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।
এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাসুদেব ধর বলেন, ‘এটি সত্যিই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’
উৎসব সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন পূজা কমিটি, মন্দির ও মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্যান্ডেল নির্মাণ ও সাজসজ্জা, প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। উৎসবের দিনগুলোতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতেও কাজ চলছে।
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এর গুরুত্ব বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও বিশেষভাবে স্বীকৃত। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে এ উৎসব দেশের সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চিত্র তুলে ধরে।
পড়ুন: ২৫ লাখ বছরের গোপন গল্প বলেই যাচ্ছে রক্তের ঝরনা!
সা/


