যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ২ ডলারের নিচে নামানো, গৃহঋণের সুদের হার ২ শতাংশে আনা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি। তবে ২০২৬ সালের অক্টোবরের পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি, বাড়ি কেনা, বিমানভাড়া ও স্বাস্থ্যবিমাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। এতে অর্থনীতি নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষও বাড়ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার বেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই ব্যবধান ভোটারদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক থাকা এবং বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম হওয়ার পরও নাগরিকদের উদ্বেগ কমছে না। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে প্রতি ১০ জনে ৯ জন মার্কিন নাগরিক জানিয়েছেন, অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁদের ধারণা গঠনে পণ্যের দাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করোনাভাইরাস মহামারির পর টানা পাঁচ বছর ধরে চলা মূল্যস্ফীতির প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতিও পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি করেছে। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপের ফলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। গবেষকদের মতে, এসব শুল্ক না থাকলে পণ্যের দাম তুলনামূলক কম হতে পারত।
এদিকে ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে তেল, পেট্রল ও ডিজেলের দামে। বিনিয়োগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই-পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগ ডাকোর মতে, ইরানে হস্তক্ষেপ এবং আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপের মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সরবরাহসংক্রান্ত চাপের অন্যতম কারণ।
অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস বলছে, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। আগস্টে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক ওপরে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউস এই পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করার সঙ্গে একমত নয়। প্রশাসনের দাবি, ট্রাম্পের নীতি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের মূল্যস্ফীতির সংকট নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প কর্মজীবী মানুষের জন্য বড় ধরনের করছাড় দিয়েছেন, ব্যবস্থাপত্রের ওষুধের দাম কমিয়েছেন, বেসরকারি খাতে ১০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং প্রায় ২০টি বাণিজ্য চুক্তি করেছেন। আগামী দুই বছরেও এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে বলে দাবি করেছে প্রশাসন।
হোয়াইট হাউসের নতুন মুখপাত্র কেটি জাকারিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে হোয়াইট হাউসের নতুন মুখপাত্র বা প্রেস সচিব হিসেবে রক্ষণশীল ধারার ভাষ্যকার কেটি জাকারিয়ার নাম ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘোষণা দেন তিনি। সেখানে কেটির প্রতি আস্থা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর সমর্থন ও আনুগত্যের প্রশংসা করেন ট্রাম্প।
পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, শুরু থেকেই কেটি তাঁর বিশ্বস্ত ও মেধাবী সমর্থকদের একজন। তাঁর সমর্থনের রেকর্ডও প্রশ্নাতীত। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের একজন নিবেদিত সমর্থক হিসেবে নতুন দায়িত্বে কেটি দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রাম্পের ভাষ্য, সংবাদমাধ্যম, মার্কিন জনগণ ও প্রশাসনের সঙ্গে কেটির ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তিনি সবার সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন বলে মনে করেন প্রেসিডেন্ট। নতুন দায়িত্বের জন্য তাঁকে শুভকামনাও জানিয়েছেন ট্রাম্প।
এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব পেয়েছেন কেটি।
গত আগস্টের শেষ দিকে ক্যারোলিন লিভিট দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে পদটি শূন্য ছিল। এরপর ৩ সেপ্টেম্বরের পর হোয়াইট হাউসের জেমস এস ব্র্যাডি সংবাদ সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের জন্য আর নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ওই দিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কেটি। তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মার্কিন জনগণের সেবা করার সুযোগ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সম্মান।
কেটি আরও জানান, প্রশাসনের প্রতিদিনের অর্জনগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং দেশের জন্য ভালো ফল নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়াই হবে তাঁর লক্ষ্য। হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি।
সাবেক মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিটের প্রশংসা করে কেটি বলেন, তাঁর উত্তরসূরি হওয়া একটি বড় মানদণ্ড পূরণের মতো বিষয়। সেই মানদণ্ড অর্জনের উপযোগী কাজ করতে তিনি প্রস্তুত বলেও জানান।
কেটি জাকারিয়ার শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক অবস্থান
ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী কেটি জাকারিয়া পেপারডাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগে অল্প সময়ের জন্য মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর জ্যেষ্ঠ যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায়ও সহযোগিতা করেছিলেন তিনি।
ট্রাম্পের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা আগেও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন কেটি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক পোস্টে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে স্থানীয় একটি ব্যায়ামাগারে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ লেখা টুপি পরাকে কেন্দ্র করে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
কেটির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যায়ামাগারটির মালিক শেষ পর্যন্ত তাঁকে টুপিটি না পরার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। জবাবে কেটি লিখেছিলেন, বামপন্থীদের সন্তুষ্ট করতে তিনি কখনোই ট্রাম্পের টুপি খুলবেন না। তাঁর মতে, এটি প্রকাশ্য অসহিষ্ণুতার উদাহরণ এবং ব্যায়ামাগারের দরজায় পৌঁছেই বাকস্বাধীনতার অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
ওই নিবন্ধে তিনি আরও লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে কারও অস্বস্তির কারণে বাকস্বাধীনতা সীমিত করার বিধান নেই। তবে এই সংশোধনী মূলত সরকারের পক্ষ থেকে মতপ্রকাশে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়; বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই সুরক্ষা সরাসরি প্রযোজ্য নয়।
পড়ুন : ২৫ লাখ বছরের গোপন গল্প বলেই যাচ্ছে রক্তের ঝরনা!
সা/


