২৫ লাখ বছরের গোপন গল্প বলেই যাচ্ছে রক্তের ঝরনা!

পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্ত। বরফে মোড়া অ্যান্টার্কটিকা। এখানে বাতাসেরও যেন শব্দ নেই। নেই সবুজ গাছ, নেই পরিচিত জনপদ। শুধু বরফ, পাথর আর দীর্ঘ নীরবতা। আর সেই নীরবতার মাঝেই টেইলর গ্লেসিয়ারের গা বেয়ে নেমে আসে এক অদ্ভুত লাল স্রোত। দেখে মনে হয় -সাদা পৃথিবীর শরীরে কে যেন গভীর ক্ষত এঁকে দিয়েছে। এর নাম Blood Falls। বাংলায় -রক্তের ঝরনা।

কিন্তু গল্পটি শুধু রঙের নয়। বরফের নিচের এই পানি যেন পৃথিবীর হাতে লেখা প্রাচীন এক চিঠি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, অ্যান্টার্কটিকা আজকের মতো এতটা বরফে ঢাকা হওয়ার আগে সমুদ্রের পানি এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল। পরে হিমবাহ এগিয়ে এসে সেই পানির একটি অংশকে নিচে বন্দি করে ফেলে। গবেষণা বলছে, এই বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস প্রায় ২৫ লাখ বছর আগের হতে পারে।

অর্থাৎ যে পানি আজ লাল হয়ে বরফের বুক থেকে বেরিয়ে আসছে -তার ভেতরে জমে থাকতে পারে এমন এক সময়ের স্মৃতি, যখন এই শীতল মরুভূমির চেহারাই ছিল অন্যরকম।

বরফ বদলেছে। জলবায়ু বদলেছে। পৃথিবীর মানচিত্রও বদলেছে। কিন্তু নিচে চাপা পড়ে থেকে গেছে পুরোনো সমুদ্রের এক টুকরো ইতিহাস। আর ২০২৬ সালের গবেষণা Blood Falls-এর গল্পে যোগ করেছে আরও বিস্ময়।

গবেষকেরা এখানকার পানি, লালচে কাদা ও পলি-সহ মোট ১৬৭টি নমুনা বিশ্লেষণ করে এমন অণুজীবের চিহ্ন পেয়েছেন, যাদের অনেকের পূর্বপুরুষের সম্পর্ক সামুদ্রিক পরিবেশের সঙ্গে। ডায়াটম, ডাইনোফ্ল্যাজেলেট, হ্যাপটোফাইট ও সিলিয়েটের মতো ক্ষুদ্র জীবের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের সেই ধারণাকেই আরও শক্ত করেছে -বরফের নিচে আটকে থাকা এই নোনা পানির উৎস সম্ভবত বহু পুরোনো সমুদ্র।

সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার – অন্ধকার, প্রচণ্ড ঠান্ডা আর প্রতিকূল পরিবেশেও জীবন টিকে আছে।
যেখানে মানুষের কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন, সেখানেই ক্ষুদ্র জীবেরা যেন লাখো বছরের নির্বাসন কাটিয়ে এখনও বলে যাচ্ছে- জীবন এত সহজে হার মানে না।

Blood Falls তাই শুধু একটি লাল জলপ্রপাত নয়। এ যেন পৃথিবীর অতীতের দরজায় ছোট্ট একটি ফাটল। যে ফাটল দিয়ে বিজ্ঞানীরা উঁকি দিচ্ছেন এমন এক পৃথিবীতে -যে পৃথিবীকে আমরা কোনোদিন দেখিনি। আর হয়তো সে কারণেই এই লাল স্রোত দেখে প্রথমে ভয় লাগে, তারপর বিস্ময়, আর সবশেষে জন্ম নেয় এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা।

আদতে এটি কোনো রক্ত নয়। কোনো প্রাণীর মৃত্যু কিংবা অলৌকিক কোনো রক্তধারাও নয়। বরফের গভীরে আটকে থাকা অতিলবণাক্ত, লৌহসমৃদ্ধ পানি যখন ফাটল গলে বাইরে বেরিয়ে বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন সেই লোহা অক্সিডাইজ হয়। অনেকটা লোহায় মরিচা ধরার মতো। আর সেই রাসায়নিক পরিবর্তনই পানিকে দেয় রক্তের মতো লাল-কমলা রং।

রক্ত নয়, লোহার রং। অভিশাপ নয়, প্রকৃতির রসায়ন। তবু সেই রক্তিম প্রবাহের প্রতিটি ফোঁটা যেন কোটি বছরের পৃথিবীর গল্প বহন করে চলেছে।

ধবধবে সাদা বরফের মাঝে তাই আজও ঝরে পড়ে লাল জল। মনে হয়, বরফের পাহাড় কাঁদছে। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় -এটা কান্না নয়। তবে এই রং পৃথিবীর অতীতের কথা বলেই যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : গোপনে কতটা সংগঠিত আওয়ামী লীগ?


দেখুন : https://www.youtube.com/watch?v=mdRUMq36tVw

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন