ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) পদত্যাগ বা নির্বাচন কমিশন সংস্কারের দাবিতে চলা বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে আটক হওয়ার পর গভীর রাতে মুক্তি পাওয়া জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি দাবি করেছেন যে, তাকে পুলিশ নয় বরং ‘অপহরণ’ করা হয়েছিল। মুক্তি পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর রোববার (১১ অক্টোবর) প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় তিনি এই বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন।
এর আগে এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি সেই খবর সম্পূর্ণ খণ্ডন করেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে তিনি গুরুগ্রাম পুলিশের কাছে কোনো ধরনের মুচলেকা দিয়েছেন। ইনস্টাগ্রামের একটি পোস্টের ক্যাপশনে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, “আমাকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়নি, আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল।”
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্র অনুযায়ী, শনিবার রাত ৩টার দিকে ধ্রুব রাঠিকে মুক্তি দিয়ে তার পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়। এর আগে শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এর সেন্ট্রাল বিহার সোসাইটিতে অবস্থিত তার নিজস্ব বাসা থেকেই তাকে আটক করা হয়েছিল।
ভিডিওবার্তায় নিজের ভারতীয় পাসপোর্ট প্রদর্শন করে ধ্রুব রাঠি সেই সমস্ত খবরের তীব্র সমালোচনা করেন, যেখানে তাকে একজন বিদেশি নাগরিক হিসেবে দাবি করে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য উস্কানিদাতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি একজন ভারতীয় নাগরিক এবং একজন সাধারণ নাগরিকের যে অধিকার রয়েছে, আমারও সেই একই অধিকার রয়েছে।”
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি জানান, শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে যখন তিনি ঘুমাচ্ছিলেন, তখন বাইরে কিছু লোকের আনাগোনা দেখে তার মা ঘরের দরজা খুলে দেন। তার দাবি অনুযায়ী, দরজায় দাঁড়ানো ব্যক্তিরা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন না, বরং সাধারণ পোশাকে থাকা প্রায় ২০ জনের একটি দল হুট করে জোরপূর্বক ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ঘটনাটির ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এই লোকেরা আক্ষরিক অর্থেই আমাকে অপহরণ করে। আমি এখানে অপহরণ শব্দটি ব্যবহার করছি, কারণ এটি কোনো গ্রেপ্তার নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমি যদি বিক্ষোভে যেতাম, তাহলে আমাকে আটক করা হতো।” তার জোরালো অভিযোগ, কোনো ধরনের নেমপ্লেট বা পরিচয়পত্র ছাড়া কিছু ‘গুণ্ডাকে’ পাঠানো হয়েছিল তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
সেদিনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ধ্রুব রাঠি বলেন, “তারা আমাকে সোজাসুজি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। মানে, একটু কল্পনা করে দেখুন, একজন অপরাধীকে যেভাবে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা আমাকে শোবার ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে যায়। এখানে আমি গুরুতরভাবে আহত হয়েছি। আমার সারা শরীরে এ ধরনের ক্ষত রয়েছে।” এছাড়া তাকে কোনো আইনি সহায়তা নিতে দেওয়া হয়নি অভিযোগ করে তিনি বলেন, তাকে তার আইনজীবীর সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
কর্তৃপক্ষের আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা কি এমন কোনো গণতান্ত্রিক দেশের কথা শুনেছেন, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক কোনো আইন ভাঙেননি, যিনি শুধু সত্যের পক্ষে এবং দেশের কল্যাণের জন্য নিজের কণ্ঠস্বর তুলেছেন, যিনি একটি উন্নত নির্বাচন কমিশনের দাবি জানিয়েছেন, তাকে তার নিজের বাড়ির শোবার ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, অপহরণ করা হয়, তার বাবা-মাকে মারধর করা হয় এবং তারপর এভাবে এভাবে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়?”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি ‘অনানুষ্ঠানিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করে ধ্রুব রাঠি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে দেশকে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
অন্যদিকে, আন্দোলনের তীব্রতার মধ্যে আটক হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তিন শীর্ষ নেতা—অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে রোববার জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দিল্লি ক্যান্ট পুলিশ স্টেশনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার পর, এক বছরের জন্য ‘শান্তি ভঙ্গ না করার’ শর্তে তাদের মুক্তি দেওয়া হয় বলে জানান দলটির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং। শনিবার দিল্লি বিমানবন্দরে একটি ফ্লাইট থেকে তাদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল এবং রোববার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। তাদের মুক্তির পর সিজেপি সামাজিক মাধ্যমে লেখে, ‘অবশেষে দিল্লি পুলিশ অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে। ককরোচরা কখনো মরে না।’
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ঘেরাও ও আন্দোলনের কারণে কেন্দ্রীয় দিল্লির ঐতিহ্যবাহী যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর পথগুলো বন্ধ করে নজিরবিহীন নিরাপত্তার বলয় তৈরি করেছিল দিল্লি পুলিশ। মূল জমায়েত আটকে দেওয়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতা শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিবাদ প্রদর্শন করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজনীতিক ও সমাজকর্মীসহ প্রায় ৩ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছিল, যাদের বড় একটি অংশকে পরবর্তীতে রাতে মুক্তি দেওয়া হয়।
পড়ুন : ফারাক্কা চুক্তি নবায়ন ও পানির ন্যায্য হিস্যা দিয়ে ভারতকে বন্ধুত্বের প্রমাণ দিতে হবে: প্রতিমন্ত্রী
সা/


