রূপপুরে প্রথমবারের মতো সফল পারমাণবিক বিক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে যা জানা গেল

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবারের মতো সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ- বায়েরা।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা আইএইএ’র গাইডলাইন অনুযায়ী, রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের স্টেজ ‘বি ওয়ান’ মোটামুটি সফলভাবে শেষ হয়েছে। সবশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ পরীক্ষার জটিলতাও কেটে গেছে। এর পরের ধাপ ‘বি টু’। এই ধাপে প্রাথমিক অপারেশনের জন্য পারমাণবিক চুল্লিকে প্রস্তুত করা হয়। এরপরই শুরু হয় ক্রিটিক্যালিটি।

এদিকে চলতি বছরের নভেম্বরের শেষ নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আশা প্রকাশ করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।

সংস্থাটির মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ জানান, আগামী ২০ নভেম্বর থেকে মাসের শেষ নাগাদ উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

এর আগে, চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু করে রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ।

২০১১ সালে স্বাক্ষরিত আন্তসরকারি চুক্তির ভিত্তিতে রোসাটম বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। কেন্দ্রটিতে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ অগ্রগতি

পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু: বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)-এর চূড়ান্ত বিদ্যুৎ অনুমোদন বা ‘বি-টু’ (B-2) লাইসেন্স পাওয়ার পর, ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে সফলভাবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ: রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম (Rosatom)-এর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২০ নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের শেষের দিকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে কম শক্তিতে গ্রিডে যুক্ত করে ধাপে ধাপে এর ক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং প্রথম ধাপে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয় ইউনিটের পরিকল্পনা: ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

প্রকল্পের মূল বিবরণ

অবস্থান: পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মানদীর তীরে অবস্থিত (ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে)।

মোট উৎপাদন ক্ষমতা: ২,৪০০ মেগাওয়াট (১,২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট)। এই কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০-১১% পূরণ করতে পারবে।

প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা: এতে রাশিয়ার সর্বাধুনিক ৩+ প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ (VVER-1200) রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ৫-স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ‘কোর ক্যাচার’-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে, যা যেকোনো দুর্যোগে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানো রোধ করবে।

অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন: প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। রাশিয়ার মূল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট (ASE) এর কারিগরি সহায়তায় এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং ব্যয়ের প্রায় ৯০% দীর্ঘমেয়াদি রুশ ঋণের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়েছে।

স্থায়িত্বকাল: বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মূল কার্যকাল ৬০ বছর, যা পরবর্তীতে আরও ২০-৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব।

প্রকল্পটির প্রধান অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোকে নিচে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হলো:

১. সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উৎপাদন খরচ হ্রাস

শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধি: বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ টানা ৬০ বছর পাওয়া যাবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে দেশের শিল্পকারখানাগুলো যে উৎপাদন সংকটে ভুগে, তার স্থায়ী সমাধান হবে।

জ্বালানি খরচ হ্রাস: তেল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের রানিং খরচ (জ্বালানি খরচ) অত্যন্ত কম ও স্থিতিশীল। এটি দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে।

২. বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়

আমদানি নির্ভরতা হ্রাস: বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG), কয়লা এবং ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে হয়। রূপপুর চালু হলে প্রতি বছর জ্বালানি আমদানি বাবদ দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

৩. জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান

জিডিপিতে অবদান: এই কেন্দ্রটি চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০-১১% একাই পূরণ করবে, যা দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আনুমানিক ২% থেকে ২.৫% অবদান রাখবে।

দক্ষ জনবল তৈরি: এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং টেকনিশিয়ানরা রাশিয়ার সহায়তায় বিশ্বমানের উচ্চ প্রযুক্তির পারমাণবিক প্রকৌশলে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। এই দক্ষ মানবসম্পদ দীর্ঘমেয়াদে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

৪. আঞ্চলিক ও স্থানীয় অর্থনীতি উন্নয়ন

পাবনা ও ঈশ্বরদীর রূপান্তর: প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে পাবনা ও ঈশ্বরদী অঞ্চলে বিশাল আবাসন, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে সাহায্য করছে।

৫. পরিবেশগত ও কার্বন ট্যাক্স সুবিধা

পরিবেশবান্ধব ও গ্রিন ইকোনমি: পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস বা কার্বন নির্গমন হয় না। কয়লা বা তেলের পরিবর্তে এই পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ট্যাক্স বা পেনাল্টি থেকে রেহাই পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এগিয়ে থাকবে।

পড়ুন : ৩১ দফার ভিত্তিতে দেশ পুনর্গঠনে কাজ চলছে: সরোয়ার আলমগীর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন