এআই অডিও প্রযুক্তি পেতে হাক্সের সঙ্গে অ্যাপলের চুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত পছন্দ ও আগ্রহ অনুযায়ী পডকাস্ট তৈরির প্রযুক্তি নিজেদের সেবায় যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। এ লক্ষ্যে এআইভিত্তিক অডিও স্টার্টআপ হাক্সের (Huxe) কয়েকজন কর্মীকে নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য মেধাস্বত্বের লাইসেন্স নিচ্ছে আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে অ্যাপলের অডিও সেবায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্ট তৈরির নতুন সুবিধা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় কমিশনের কাছে জমা দেওয়া একটি নথিতে অ্যাপল হাক্সের সঙ্গে এ চুক্তির বিষয়টি জানিয়েছে। চুক্তির আওতায় হাক্সের কিছু কর্মী ও তাদের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবে অ্যাপল। তবে এ উদ্যোগের মাধ্যমে পুরো হাক্স প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণ করছে না প্রযুক্তি জায়ান্টটি। প্রযুক্তি খাতে এ ধরনের ব্যবস্থাকে ‘রিভার্স অ্যাকুই-হায়ার’ বলা হয়। এ পদ্ধতিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের নিয়োগের পাশাপাশি তাদের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকারও নেওয়া হয়।

বর্তমানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীদের জন্য আরও ব্যক্তিগত ও সহজে ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল সেবা তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ লেখা, গবেষণাপত্র, বিভিন্ন নথি ও জটিল তথ্যকে সহজে বোঝার উপযোগী অডিওতে রূপান্তরের প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। অ্যাপলের হাক্সের প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগও এ প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এআইনির্ভর অডিও প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীর আগ্রহ, প্রয়োজন ও সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কথোপকথনের ধরনে অডিও কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব। এতে প্রচলিত পডকাস্টের মতো নির্দিষ্ট সময় ধরে তৈরি অনুষ্ঠান শোনার পাশাপাশি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি অডিও শোনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে হাক্সের প্রযুক্তি অ্যাপলের কোন সেবায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে অ্যাপলের বিদ্যমান পডকাস্ট অ্যাপে এ ধরনের সুবিধা যুক্ত হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

হাক্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন কয়েকজন ডেভেলপার, যাঁরা এর আগে গুগলের নোটবুকএলএম (NotebookLM) প্রকল্পে কাজ করেছেন। নোটবুকএলএমে এআই ব্যবহার করে তথ্য ও নথির ভিত্তিতে অডিও আলোচনা তৈরির সুবিধা রয়েছে। এ সুবিধার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর দেওয়া উপকরণকে কথোপকথনের আদলে অডিওতে রূপান্তর করা যায়।

এ ধরনের প্রযুক্তি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে শিক্ষার্থী, গবেষক, পেশাজীবী এবং যাঁদের নিয়মিত বিপুল পরিমাণ তথ্য পড়তে হয়, তাঁদের জন্য। দীর্ঘ প্রতিবেদন বা জটিল বিষয়বস্তু সরাসরি পড়ার পরিবর্তে অডিও শুনে মূল ধারণা বোঝার সুযোগ পাওয়া যায়। পাশাপাশি চলার পথে, ভ্রমণের সময় কিংবা অন্য কাজের ফাঁকেও এসব অডিও শোনা সম্ভব।

নোটবুকএলএমের মতো সেবায় ব্যবহারকারীর সরবরাহ করা তথ্যের ভিত্তিতে অডিও তৈরি করা হলেও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কনটেন্ট সাজানোর ক্ষেত্রে আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হতে পারে। হাক্সের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি অ্যাপলের এ ধরনের উদ্যোগে কাজে লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চলতি বছরের ২১ মে হাক্স তাদের সেবা বন্ধের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, অ্যাপল ও গুগলের অ্যাপ স্টোর থেকে তাদের অ্যাপ সরিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সেবা বন্ধ করার পর ব্যবহারকারীদের তথ্য মুছে ফেলা হবে বলেও জানানো হয়। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, তাদের দল নতুন কাজে যুক্ত হচ্ছে এবং হাক্স পণ্যের উন্নয়ন আর চালিয়ে নেওয়া হবে না।

এরপর ৯ জুন ইউরোপীয় কমিশনকে চুক্তির বিষয়ে অবহিত করে অ্যাপল। তবে হাক্সের কতজন কর্মীকে নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কেউ প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন কি না কিংবা তাঁরা অ্যাপলের কোন প্রকল্পে কাজ করবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

একইভাবে হাক্সের প্রযুক্তির কোন অংশ অ্যাপল ব্যবহার করবে এবং সেটি বাস্তবায়নে কত সময় লাগতে পারে, তা-ও স্পষ্ট নয়। ফলে চুক্তিটি অ্যাপলের ভবিষ্যৎ পণ্য ও সেবায় ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আনবে, তা জানতে আরও তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।

ধারণা করা হচ্ছে, অ্যাপলের পডকাস্ট অ্যাপে এআইনির্ভর ব্যক্তিগত অডিও তৈরির সুবিধা যুক্ত করার ক্ষেত্রে হাক্সের প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। এমন সুবিধা চালু হলে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দ, আগ্রহ ও প্রয়োজন অনুযায়ী অডিও কনটেন্ট পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যবহারকারী প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি কিংবা ইতিহাসের বিষয়ে আগ্রহী হলে তাঁর পছন্দ অনুযায়ী অডিও আলোচনার বিষয়বস্তু সাজানো সম্ভব হতে পারে। একইভাবে কোনো নির্দিষ্ট নথি বা তথ্যের ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত অডিও সারাংশ তৈরির সুবিধাও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এগুলো সম্ভাব্য ব্যবহারমাত্র; অ্যাপল এখনো এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।

এআইনির্ভর ব্যক্তিগত অডিও তৈরির সুবিধা চালু হলে কনটেন্ট খোঁজা ও শোনার অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আসতে পারে। ব্যবহারকারীদের আলাদাভাবে পছন্দের প্রতিটি অনুষ্ঠান খুঁজে বের করার পরিবর্তে তাঁদের আগ্রহ অনুযায়ী তৈরি অডিও পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সুবিধার কার্যকারিতা নির্ভর করবে অডিওর মান, তথ্যের নির্ভুলতা, ব্যবহারকারীর পছন্দ বোঝার সক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের নীতির ওপর

এআই ব্যবহার করে অডিও কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এর আগে স্পটিফাইও এআই ব্যবহার করে পডকাস্ট তৈরির সুবিধা চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী অডিও কনটেন্ট তৈরি ও সরবরাহের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।

এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে বড় সুযোগের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি অডিওতে ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা কিংবা প্রসঙ্গের ভুল উপস্থাপনা থাকলে ব্যবহারকারীরা বিভ্রান্ত হতে পারেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত পছন্দ বোঝার জন্য ব্যবহারকারীর তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সব মিলিয়ে হাক্সের কর্মী ও প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ অ্যাপলের এআইভিত্তিক অডিও সেবা উন্নয়নের সম্ভাব্য একটি পদক্ষেপ। তবে প্রযুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে কাজে লাগানো হবে, নতুন কোনো সুবিধা চালু হবে কি না এবং ব্যবহারকারীরা কখন তা পাবেন—এসব বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। এআইনির্ভর ব্যক্তিগত অডিও ভবিষ্যতে প্রচলিত পডকাস্টের বিকল্প হবে, নাকি বিদ্যমান অডিও সেবার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

পড়ুন:মাইক্রোসফটসহ ৮ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের গ্রিনকার্ড স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন