ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, একজন সরকারপ্রধান হিসেবে নিজ দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি জনগণের অধিকার রক্ষায় কাজ করছেন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে ঢাকা-১৭ আসনের ৮টি মন্দিরের প্রতিনিধিরা সাক্ষাৎ করে তাকে পূজার আমন্ত্রণ জানান। এ সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা বিএনপির বিগত দিনের নানা কল্যাণমূলক উদ্যোগ, পূজার ছুটি ও অনুদান বৃদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বিগত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে তারা যে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবনযাপন করছেন তা তুলে ধরেন।
নেতাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা নিজেরাই বলেছেন, এই অল্প সময়ের মধ্যে যতটুকু কাজ সম্ভব, আমরা তা করেছি। আরও কিছু বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি। এ থেকেই প্রমাণ হয়, আমাদের সদিচ্ছা রয়েছে।”
মুক্তিযুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস
দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেই সংগ্রামে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমানভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, “জাতির ক্রান্তিলগ্নে যখন আমরা ধর্মকে বিবেচনায় আনিনি, তখন অন্য কাজে কেন ধর্মকে বিবেচনা করব? দেশটা সবাই মিলে স্বাধীন করেছি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সবাই অংশ নিয়েছি।” ফ্যাসিবাদের শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক নিপীড়নের সময় মুসলমান কর্মীদের পাশাপাশি হিন্দু কর্মীরাও একইভাবে নির্যাতিত হয়েছেন এবং সেখানে ধর্মের কোনো ভেদাভেদ ছিল না।
নাগরিক অধিকার ও সুরক্ষার অঙ্গীকার
নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আল্লাহ তায়ালা আমাকে একটি সুযোগ দিয়েছেন। আমার অবস্থান থেকে, আমার ক্ষমতার মধ্যে যতটুকু সম্ভব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করব। আমি ধর্মের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বরং মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করব।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে আপনার যে অধিকার, আপনার যা প্রাপ্য— তা নিশ্চিত করতে এবং সরকারপ্রধান হিসেবে আপনাদের প্রতি আমার যে কর্তব্য, আমি সেটাই পালন করার চেষ্টা করছি।” প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মতবিনিময় সভায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের মধ্য থেকে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রমেশ দত্ত, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সভাপতি অলক সাহা, বারিধারা ডিওএইচ পূজা কমিটির সভাপতি জীবন কানাই দাস, ব্রিটিশ চন্দ্র কর্মকার, নারায়ণ চন্দ্র সাহা, প্রদীপ চন্দ্র দাস, শিখা রানী দাস, শ্যামল কুমার দাস ও রাজিব কুমার আচার্য উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য তারেক রহমানের প্রতিনিধি আব্দুর রহমান সানি এবং বনানী সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ সফিকুজ্জামান রতনও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
কানাডার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক ও রোহিঙ্গা সংকট
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার টেকসই সমাধান ও তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কানাডার সুনির্দিষ্ট সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু অর্থায়নসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে কানাডার অংশীদারিত্ব প্রত্যাশা করেছে বাংলাদেশ।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত অংশীদারির বিভিন্ন দিক নিয়ে খোলামেলা কথা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমারকেন্দ্রিক সমাধান
বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার এই দীর্ঘদিনের অবস্থান দেশের অর্থনীতি এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।”
অন্যদিকে কানাডার প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার গুরুত্বের সাথে একমত পোষণ করেন। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও বিশেষ অগ্রাধিকার পায়।
পড়ুন : আফগানিস্তানকে ৪৭৯ রানের লক্ষ্য দিল বাংলাদেশ
সা/


