যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে লক্ষ্য করে স্লোগান ও কটূক্তি করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এতে জড়িতদের ‘আওয়ামী সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের নাগরিকদের ওপর এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি ও সমসাময়িক ইস্যুতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এসব কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা জানান, ঢাকা ও শ্যামপুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড কর্ডলাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। তিনি জানান, ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত প্রস্তাবিত ৮১ কিলোমিটার রেলপথের পুরোটাই এলিভেটেড (উড়াল) হবে এবং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নতুন এ কর্ডলাইন (সোজা ও সংক্ষিপ্ত রেললাইন) নির্মিত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার কমবে এবং একই সঙ্গে যাতায়াতের সময় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুরো রেলপথ এলিভেটেড হওয়ায় প্রায় ৩২২ একর জমি সাশ্রয় হবে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৯০১ কোটি টাকা এবং জমি অধিগ্রহণের পর এটি বাস্তবায়নে চার বছর লাগবে বলে জানান তিনি।
এদিকে নিউইয়র্কের ঘটনা ও দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. জাহেদ বলেন, ড. ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টা আওয়ামী সন্ত্রাস। এই বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার। প্রতিশোধ নয়, ন্যায় বিচার নিশ্চিতে হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা।
সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে তিনি বিদেশে বাংলাদেশিদের ওপর হামলা ও হেনস্তার বিষয়ে বলেন, ‘বিদেশে ড. ইউনূস সহ বাংলাদেশের নাগরিকদের উপরে যে ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে, এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিশোধ নয়, ন্যায় বিচার নিশ্চিতে শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় ঢাকা।’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাথে কোনো আপস বা রিকনসিলিয়েশনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, রিকনসিলিয়েশনের জন্য যারা মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ করেছে তাদের বিচার হতে হবে। যে দল মানবতাবিরোধী অপরাধ করে চলে গেছে, তার জায়গা থেকে এখন পর্যন্ত অনুতাপের কোনও লক্ষণ নেই, উপরন্তু তারা নানা রকম সংকট করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার চেষ্টা হয়েছ। তার অপরাধ হচ্ছে তিনি শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেন নিয়েছেন। শুধু এটি নয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একই ধরনের আচরণের চেষ্টা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, যে দল প্রকাশ্যে দেশের ভেতরে নানারকম সহিংসতা ও সন্ত্রাস উস্কে দেয়ার চেষ্টা করে তাদের দলের প্রধান করে; সেখানে সরকারের দিক থেকে রিকনসিলিয়েশনের ইনিশিয়েটিভ নেয়ার প্রশ্নই আসে না।
রিকনসিলিয়েশনের নূন্যতম কোনো সম্ভাবনা যদি থেকে থাকে, তাহলে সেটি আওয়ামী লীগকে তার জায়গা থেকে বলার কথা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, দুই বছর পরে এবং তাদের আচরণ দেখে রিকনসিলিয়েশনের আদৌ কোনও সম্ভাবনা আমি দেখি না। ক্ষমা চাওয়া, অনুতাপ দূরে থাকুক; তারা হুমকি দিচ্ছে এবং নানা রকম সহিংসতা উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাটি কোনো সাধারণ প্রতিবাদ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ড. ইউনূস, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, অভিনেত্রী বাঁধনকে হেনস্তার চেষ্টা প্রেশার গ্রুপ ট্রুপ কিছু না, এগুলো আওয়ামী সন্ত্রাস। সেটা নিয়ে লিগ্যাল প্রসেস শুরু হয়েছে, ভবিষ্যতেও নেয়া হবে। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের এ ধরনের পদক্ষেপ আনচ্যালেঞ্জড যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে ঠিক কী ঘটেছিল:
এর আগে, স্থানীয় সময় সোমবার (১২ অক্টোবর) কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে দোহা থেকে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে পৌঁছান ড. ইউনূস। বিমানবন্দরের আট নম্বর টার্মিনালে পৌঁছানোর পর হুইলচেয়ারে থাকা ড. ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি কটু মন্তব্য ও স্লোগান দেন।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানবন্দরের ভেতরে কয়েকজন লোক উচ্চস্বরে ‘ইউ আর আ টেরোরিস্ট’, ‘ইউ কিল্ড বাংলাদেশিজ’, ‘গো ব্যাক’, ‘ইউ ডেস্ট্রয় ডেমোক্রেসি’ এবং ‘ইউ কিল্ড থাউজেন্ডস অব পুলিশ’ বলে স্লোগান দিচ্ছেন।
ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে বারবার ড. ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্রে আসার কারণ জানতে চেয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি সন্ত্রাসী। আপনি বাংলাদেশে মানুষ হত্যা করেছেন। কেন এখানে এসেছেন? আমাদের বলুন, কেন এসেছেন?’
একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি বাংলাদেশে দুই লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার এবং হাজার হাজার পুলিশ সদস্যকে হত্যার অভিযোগ তুলে বলেন, ‘আপনি আমার দেশে হাজার হাজার পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছেন। কেন এখানে এসেছেন? কেন এখানে এসেছেন?’
একই সাথে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ তুলে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘তিনি আমার দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করেছেন। তিনি কেন এখানে এসেছেন?’
পরবর্তীতে সঙ্গে থাকা সহযোগী ও নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় ড. ইউনূসকে দ্রুত সেখান থেকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়, তাদের ক্ষোভের সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ড. ইউনূসের পক্ষ থেকেও ঘটনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পড়ুন : এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে সৌদি যুবরাজ, কিন্তু কেন?
সা/


