৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে ভাইদের কাছে ফিরলেন পরী বেগম, বাংলা ভুললেও ভোলেননি স্বজনদের

মাত্র ১০ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিলেন পরিবারের কাছ থেকে। এরপর মানব পাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে ভারত হয়ে চলে যান পাকিস্তানে। সেখানেই কেটে যায় জীবনের দীর্ঘ ৫০ বছর। গড়ে ওঠে সংসার, জন্ম নেয় সন্তান। কিন্তু শৈশবের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি জন্মভূমি কিংবা আপনজনদের মুখ। অবশেষে ৬০ বছর বয়সে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে ভাইদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন পরী বেগম।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ পাঁচ দশক পাকিস্তানে বসবাস করতে গিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। নিজের ভাইদের সামনে বসেও বাংলায় মনের কথা প্রকাশ করতে পারছেন না। কথা বলছেন উর্দুতে। তবে ভাষার এই ব্যবধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি ভাই-বোনের পুনর্মিলনে। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর একে অপরকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

পরী বেগমের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। তাঁর বাবার নাম মমিন মাতুব্বর। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ বছর আগে মাত্র ১০ বছর বয়সে নিখোঁজ হন পরী বেগম। পরে মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে প্রথমে ভারত এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে।

পরিবারের ভাষ্য, পাকিস্তানে কয়েক দফা হাতবদলের পর নিঃসন্তান এক দম্পতির আশ্রয়ে যান পরী বেগম। ওই দম্পতি তাঁকে নিজেদের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের এক নাগরিকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়।

নতুন দেশ, নতুন পরিবার আর সংসারের ব্যস্ততায় জীবনের পাঁচ দশক পার হলেও শৈশবে ফেলে আসা স্বজনদের স্মৃতি ভুলতে পারেননি পরী বেগম। বিশেষ করে বাবা-মা ও ভাইদের কথা মনে রেখেছিলেন তিনি। তবে এত বছর পর তাঁদের সঙ্গে আবার দেখা হবে, এমন আশা একসময় প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা।

যেভাবে খোঁজ মিলল পরিবারেরপরী বেগমের হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সন্ধান পাওয়ার ঘটনাটিও বেশ চমকপ্রদ। আর এই যোগাযোগের সূত্র তৈরি করেন রাজশাহী থেকে পাকিস্তানে পড়তে যাওয়া দুই বাংলাদেশি যুবক।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ওই দুই যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় পরী বেগমের নাতির। কথাবার্তার একপর্যায়ে নানি নন, নিজের দাদির বাংলাদেশে হারিয়ে যাওয়া পরিবারের গল্প তাঁদের জানান তিনি।

বিষয়টি জানার পর ওই দুই যুবক পরী বেগমের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর কাছ থেকে বাংলাদেশের বাড়ির ঠিকানা ও পরিবারের সদস্যদের পরিচয় জানার চেষ্টা করেন। এ সময় পরী বেগম জানান, তাঁর বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দায়। বাবার নাম মমিন মাতুব্বর। বড় ভাই নওশের আলী মাতুব্বর, মেজ ভাই সাইফুল মাতুব্বর এবং ছোট ভাই সোলেমান মাতুব্বর।

এই নাম ও ঠিকানার সূত্র ধরে বাংলাদেশে ফিরে স্বজনদের খোঁজ শুরু করেন দুই যুবক। একপর্যায়ে নগরকান্দায় পরী বেগমের পরিবারের সন্ধান পান তাঁরা।

এরপর দীর্ঘ ৫০ বছর পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয় হারিয়ে যাওয়া ভাই-বোনের। একে অপরের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় সরাসরি দেখা করার অপেক্ষা। অবশেষে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসেন পরী বেগম।

ভাষা বদলেছে, বদলায়নি ভালোবাসা

দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর বোনকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন ভাইয়েরা। ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া সেই বোনকে এত বছর পর ফিরে পাবেন, তা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তাঁরা।

সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সবার চেহারা। বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে। শৈশবের পরিচিত পরিবেশও আর আগের মতো নেই। কিন্তু ভাই-বোনের প্রতি ভালোবাসা রয়ে গেছে আগের মতোই।

পুনর্মিলনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো, পরী বেগম এখন আর বাংলায় স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না। দীর্ঘদিন পাকিস্তানে বসবাস করায় তাঁর দৈনন্দিন কথাবার্তার ভাষা হয়ে উঠেছে উর্দু। দেশে ফিরে গণমাধ্যমের কাছেও উর্দু ভাষাতেই নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও স্বজনদের ফিরে পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন তিনি।

ভাইদের সামনে বসে উর্দুতেই মনের কথা বলছেন পরী বেগম। তাঁর সব কথা বুঝতে না পারলেও আবেগ ও অনুভূতি বুঝতে পারছেন স্বজনেরা। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ শেষে একে অপরকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট।

পরী বেগমকে ঘিরে বাড়িতে আনন্দের আমেজ

এদিকে দীর্ঘ ৫০ বছর পর পরী বেগমের ফিরে আসার খবরে নগরকান্দায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চলছে নানা আয়োজন। আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি আশপাশের প্রতিবেশীরাও তাঁকে একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করছেন।

কেউ জানতে চাইছেন কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, কেউ শুনছেন পাকিস্তানে কাটানো জীবনের গল্প। আবার কেউ অবাক হচ্ছেন এত বছর পরও জন্মভূমি ও পরিবারের পরিচয় মনে রাখার ঘটনায়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পরী বেগমকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে মসজিদে দোয়া মাহফিলেরও আয়োজন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া বোনকে কাছে পাওয়ায় পুরো পরিবারে যেন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

মাত্র ১০ বছর বয়সে যে মেয়েটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অচেনা দেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই পরী বেগম জীবনের ৫০ বছর পর ফিরে এসেছেন নিজের শেকড়ে। এর মধ্যে বদলে গেছে তাঁর জীবন, ভাষা ও চারপাশের পরিবেশ। কিন্তু মুছে যায়নি জন্মভূমির পরিচয় কিংবা আপনজনদের স্মৃতি।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের বিচ্ছেদের পর পরী বেগমের এই ফিরে আসা শুধু একটি পরিবারের পুনর্মিলন নয়; এটি শেকড়ের প্রতি টান, স্বজনদের ভালোবাসা এবং হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার এক আবেগঘন ঘটনা।

পড়ুন:দাগনভূঞা থানা পুলিশের উদ্যোগে বাক্‌প্রতিবন্ধী নারীকে স্বামীর কাছে হস্তান্তর

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন