ভোরের আলো ফুটতেই নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের সাধারণ এক বাড়ির উঠান মুখর হয়ে ওঠে শিশুদের কণ্ঠে। সুললিত কণ্ঠে ভেসে আসে পবিত্র কোরআনের আয়াত। শিশুদের যিনি পরম মমতায় হাতে ধরে আরবি হরফ লেখা ও সহিহ শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শেখাচ্ছেন, তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বড় মাদ্রাসার শিক্ষক নন; তিনি গ্রামেরই সাধারণ এক গৃহবধূ- মোসাম্মত খাদিজা আক্তার (৩৫)। সংসারের শত ব্যস্ততা সামলে বিনা বেতনে গ্রামের শিশুদের কোরআনের আলোয় আলোকিত করার পাশাপাশি, নিজের অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ নিজ হাতে পবিত্র কোরআন শরীফ লিখে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
স্মার্টফোনের যুগে যখন মানুষের অবসর কাটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা পরচর্চায়, তখন খাদিজা আক্তার বেছে নিয়েছেন ব্যতিক্রমী ও পুণ্যময় পথ। তার এই অসাধারণ কীর্তি ও নীরব সমাজসেবার গল্প এখন মানুষের মুখে মুখে।
খাদিজা আক্তারের আরবি হাতের লেখার প্রতি ভালোবাসা শৈশব থেকেই। তবে সম্পূর্ণ কোরআন শরীফ নিজ হাতে লেখার ভাবনাটি আসে খুব সাধারণ একটি ঘটনা থেকে। কিছুদিন আগে তিনি একটি স্মার্টফোন কেনেন। ফোনটি হাতে পাওয়ার পর তার মনে হলো- অযথা মোবাইলে সময় নষ্ট করে কিংবা পাড়া-প্রতিবেশী নারীদের সাথে বসে অহেতুক গল্পগুজব ও পরচর্চায় সময় ব্যয় না করে, সেই সময়টুকু যদি কোনো ভালো কাজে লাগানো যায়।
যেহেতু ছোটবেলা থেকেই তার আরবি হাতের লেখা সুন্দর ছিল, তাই হঠাৎ তার মনে ইচ্ছা জাগে নিজের হাতের লেখার চর্চা করার এবং সম্পূর্ণ কোরআন শরীফ নিজ হাতে লিখে শেষ করার। এই ইচ্ছার কথা জানান স্বামী পেশায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ জজ মিয়াকে। স্ত্রীর এমন মহৎ উদ্যোগে সানন্দে সাড়া দিয়ে জজ মিয়া বাজার থেকে সাদা কাগজের দিস্তা কিনে এনে দেন। কাগজ পেয়েই বিসমিল্লাহ বলে লেখা শুরু করেন খাদিজা। টানা দুই-তিন দিন লেখার পর তার আত্মবিশ্বাস জন্মে, তিনি পুরো কোরআন শরীফ লিখে শেষ করতে পারবেন। এরপর ধৈর্য, নিষ্ঠা ও ভালোবাসার সাথে দিনরাত পরিশ্রম করে দুই মাসে ৪০টি কলমের কালির সাহায্যে ৭৩০ পৃষ্টায় সম্পূর্ণ (৩০ পারা) পবিত্র কোরআন নিজ হাতে লিখে শেষ করেন এই গৃহবধূ।
খাদিজা আক্তারের বাবার বাড়ি নেত্রকোনা সদর উপজেলার লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের বেলাটি গ্রামে। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতেখড়ি আনন্দ নিকেতন প্রাইমারি স্কুলে এবং পরবর্তীতে বিরামপুর হাজী ফয়েজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলের লেখাপড়ার পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন মসজিদের মক্তবে আরবি পড়তেন তিনি। তবে তার জীবনে মোড় ঘুরে যায় স্থানীয় শানকিওরা এলাকার মাওলানা আশরাফুল হুজুরের মক্তবে ভর্তি হওয়ার পর।
মাওলানা আশরাফুলের কাছে মাত্র তিন মাসেই কায়দা ও আমপারা শেষ করে কোরআন শরীফ সবক নেন কিশোরী খাদিজা। তার ঝরঝরে তেলাওয়াত এবং মুক্তোর মতো সুন্দর আরবি হাতের লেখা দেখে মুগ্ধ হন ওস্তাদ আশরাফুল। তিনি কিশোরী খাদিজাকে উৎসাহ দিয়ে বলেন, “তোমার লেখা ও পড়া দুটোই চমৎকার, তুমি বেশি করে লেখার চর্চা করবে। একটু প্রশিক্ষণ পেলে তুমি নিজেই মক্তবে পড়াতে পারবে।”
ওস্তাদের পরামর্শেই খাদিজার বাবা মেয়েকে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সে বড় ভাই এবং ওস্তাদ মাওলানা আশরাফুলের হাত ধরে ঢাকা উত্তরার ‘খাতুনে জান্নাত মহিলা মাদ্রাসায়’ যান খাদিজা। সেখান থেকে ২৫ দিনের বিশেষ মুয়াল্লিমা (শিক্ষকতা) প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
প্রশিক্ষণ শেষে গ্রামে ফিরে ওস্তাদ আশরাফুলের মক্তবেই শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব পান তিনি। নিজের লেখাপড়ার পাশাপাশি মক্তবে শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে পাশের গ্রাম বিরামপুরের ‘মুকলেছ সিটি কিন্ডারগার্টেন’-এ প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আরবি শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
এসএসসি পরীক্ষার পর ২০০৮ সালের শেষের দিকে, আনুমানিক ১৮ বছর বয়সে আমতলা ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ জজ মিয়ার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন খাদিজা। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে তিনি ভিন্ন চিত্র দেখতে পান। তিনি লক্ষ্য করেন, পুরো এলাকায় শিশুদের আরবি শেখার মতো কোনো মক্তব নেই, মসজিদেও তখন নিয়মিত কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। গ্রামের শিশুরা সারাদিন কেবল খেলাধুলা আর ছোটাছুটি করেই সময় পার করছে।
বিষয়টি ধর্মপ্রাণ খাদিজার মনে গভীর দাগ কাটে। প্রতিদিন সকালে যখন তিনি নিজ ঘরে সুললিত কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াত করতেন, তখন আশপাশের মানুষ ও শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। একদিন তিনি প্রতিবেশীদের বলেন, “আমি তো বাবার বাড়িতে থাকতে মক্তব ও স্কুলে আরবি পড়িয়েছি। আপনারা চাইলে আপনাদের বাচ্চাদের আমার কাছে পাঠাতে পারেন, আমি ওদের কোরআন শেখাব।”
তার প্রস্তাবে সাড়া পড়ে যায় পুরো গ্রামে। অভিভাবকরা আনন্দের সাথে তাদের সন্তানদের পাঠাতে শুরু করেন খাদিজার কাছে। দেখতে দেখতে তার উঠানেই গড়ে ওঠে অনানুষ্ঠানিক এক মক্তব, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একসময় ৪০ থেকে ৫০ জনে গিয়ে ঠেকে। এরই মাঝে পাশের গ্রাম মালিকপুরে কেজি স্কুলেও আরবি হাতের লেখা ও তেলাওয়াতের দক্ষতার কারণে শিক্ষক হিসেবে ডাক পান তিনি। করোনার প্রাদুর্ভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত টানা দুই বছর সেখানেও শিক্ষকতা করেন।
প্রায় ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে খাদিজা আক্তার ও জজ মিয়া দম্পতির কোলজুড়ে এসেছিল তিন পুত্রসন্তান। নিয়তির নির্মম পরিহাসে তাদের মেজো ছেলেটি মারা যায়। সন্তান হারানোর সেই গভীর শোক বুকে পাথর চাপা দিয়েও গ্রামের কোমলমতি শিশুদের মাঝেই নিজের সান্ত্বনা খুঁজে নিয়েছেন এই মা। বর্তমানে তার বড় ছেলে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ছোট ছেলেটির বয়স প্রায় পাঁচ বছর, যাকে সবেমাত্র প্রাক-প্রাথমিকে (শিশু শ্রেণিতে) ভর্তি করা হয়েছে।
বর্তমানে আতকাপাড়া গ্রামের মসজিদে সীমিত পরিসরে ১০-১২ জন শিশু আরবি পড়লেও, খাদিজা আক্তারের ঘরের মক্তবে এখনো তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫ জন। প্রতিদিন গড়ে অন্তত ২৫ জন শিশু- যাদের বয়স সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে এবং যাদের অধিকাংশই কন্যাশিশু- তার কাছে নিয়মিত আরবি লেখা ও কোরআন পড়া শিখছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অনুপ্রেরণাদায়ক বিষয় হলো, অটোরিকশা চালক স্বামীর সীমিত আয়ের সংসার হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মক্তবে পড়ানোর বিনিময়ে তিনি কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একটি টাকাও বেতন বা হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করেন না। সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ও বিনা বেতনে তিনি দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
যখন প্রশ্ন করা হয় কেন তিনি বিনা পারিশ্রমিকে এত পরিশ্রম করছেন এবং কীভাবে সম্পূর্ণ কোরআন লেখার ধৈর্য পেলেন, তখন অত্যন্ত বিনয়ের সাথে খাদিজা আক্তার জানান, “প্রথমতো, আল্লাহ সন্তুষ্টি লাভে আশায়। দ্বিতীয়তো, পাঁচজন মহিলার সাথে বসে বাজে আলাপ না করে আমি চেয়েছি আমার সময়টা ভালো কাজে ব্যয় হোক। আমার ওস্তাদ বলেছিলেন আমার হাতের লেখা সুন্দর, সেই অনুপ্রেরণা থেকেই চেষ্টা করেছি। আর বাচ্চাদের পড়ালে আমার নিজের চর্চাও থাকে, সওয়াবও হয়।”
প্রাতিষ্ঠানিক বড় কোনো ডিগ্রি বা বিত্ত-বৈভব না থাকলেও, সদিচ্ছা আর একাগ্রতা থাকলে সমাজে নীরব বিপ্লব ঘটানো যায়- নেত্রকোনার গৃহবধূ খাদিজা আক্তার তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। একদিকে নিজ হাতে সম্পূর্ণ কোরআন শরীফ লিখে নিজের শিল্পসত্তা ও ঈমানি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, অন্যদিকে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বিনা বেতনে গ্রামের শত শত শিশুকে কোরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন আলোকিত এক প্রজন্ম। আলোকবর্তিতা খাদিজা আক্তারের এই জীবনসংগ্রাম ও নিঃস্বার্থ সাধনা কেবল নেত্রকোনা নয়, পুরো দেশের মানুষের জন্যই অনন্য এক অনুপ্রেরণা।
পড়ুন : সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা আধুনিকায়নের আশ্বাস রেলমন্ত্রীর


