তহশিলদার আড়ালে, অফিস সহায়ক দেলোয়ারের নিয়ন্ত্রণে বালিগ্রাম ভূমি অফিস!

মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির নামজারি করতে গিয়ে ১৬ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবির অভিযোগ উঠেছে। কারও অভিযোগ, চাহিদামতো টাকা দিতে না পেরে কাজ না করিয়েই ফিরতে হয়েছে। আবার কেউ দরকষাকষির পর অর্থ দিয়ে দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরি করে নামজারির কাজ সম্পন্ন করেছেন। সরকারি ভূমিসেবা নিতে গিয়ে এমন ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগের তির ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক দেলোয়ার হোসেনের দিকে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু বাপ্পি ও জহির তালুকদার নন, ইউনিয়নের আরও অনেক মানুষ ভূমিসেবা নিতে গিয়ে একই ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, নামজারির মতো নিয়মিত সরকারি সেবা পেতেও নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হচ্ছে।

৪০ হাজার টাকা দাবি, দরকষাকষিতে ১০ হাজারে কাজ

বালিগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা বাপ্পির অভিযোগ, জমির নামজারি করতে গেলে প্রথমে অফিস সহায়ক দেলোয়ার হোসেন তাঁর কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও কাজ সম্পন্ন করতে তাঁকে প্রায় এক বছর ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাপ্পির অভিযোগ, জমির কাগজপত্রের কাজ করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় তাঁকে আর্থিক চাপের পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতারও শিকার হতে হয়েছে।

১৬ হাজার টাকা দিতে না পেরে ফিরে গেলেন জহির

সনমন্দি এলাকার আব্দুর রহমান তালুকদারের ছেলে জহির তালুকদারের অভিযোগ, ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করতে অফিস সহায়ক দেলোয়ার হোসেন তাঁর কাছে ১৬ হাজার টাকা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দিতে না পারায় নামজারি না করিয়েই ফিরে আসতে হয়েছে তাঁকে।

জহিরের দাবি, তাঁকে বলা হয়েছিল, নামজারির কাজ করাতে হলে সংশ্লিষ্ট অফিস সহায়কের কাছেই যেতে হবে। এতে সরকারি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ অসহায় অবস্থায় পড়ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

২৮ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ আব্দুল হালিমের

পূর্ব দর্শনা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিমের অভিযোগ, তাঁর জমির নামজারি করতে ২৮ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এত টাকা জোগাড় করতে না পারায় কাজ না করিয়েই ফিরে যান তিনি।

আব্দুল হালিমের দাবি, নামজারির জন্য নির্ধারিত সরকারি ফির তুলনায় দাবিকৃত অর্থ অনেক বেশি। এ বিষয়ে নির্ধারিত ফি ও অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও তিন হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ

একই ইউনিয়নের বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, জমির কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অফিস সহায়ক দেলোয়ার হোসেন তাঁর কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নিয়েছেন। তাঁর দাবি, টাকা না দিলে কাজ করানো কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় আরও কয়েকজন বাসিন্দা ভূমিসেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ করেছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র ঠিক করতে গিয়ে আর্থিক চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

‘উপরের স্যারদের ম্যানেজ করেই কাজ করি’

অভিযোগকারীদের দাবি, দেলোয়ার হোসেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে কাজ করার কথা বলেছেন। তাঁদের আরও অভিযোগ, আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন এমন বক্তব্যও দিয়েছিলেন।

অভিযোগ অস্বীকার দেলোয়ারের

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দেলোয়ার হোসেন টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন আর কোনো কাজকর্ম নেই, সব কাজকর্ম অনলাইনে। কেউ যদি বলে থাকে আমরা কারও কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়েছি, তাহলে তারা আমাদের হয়রানি করার জন্য এসব করছে।’

ভূমি অফিসের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের মিজান স্যার দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তাই স্যারের নির্দেশেই এই কাজগুলো আমি করি। আমি যদি কোনো দুর্নীতি-অনিয়ম করে থাকি, সেটা দেখবে আমার স্যার। আপনি বলার কে? আমার বিষয়ে আপনারা ইউএনও স্যারকে বলেন এবং ডিসি স্যারকে গিয়ে বলেন। তাঁরা সবাই আমার সম্পর্কে জানেন।’

বক্তব্য পাওয়া যায়নি ভূমি কর্মকর্তার

বালিগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো বিষয় জানতে চাইলে আমার অফিস সহায়ক দেলোয়ারের সঙ্গে কথা বলেন।’

ইউএনওর আশ্বাস, সত্যতা মিললে ব্যবস্থা

অভিযোগের বিষয়ে ডাসার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ বলেন, ‘প্রত্যেকটি ভূমি অফিসে একজন করে তহশিলদার রয়েছেন। একজন তহশিলদারের কাজ কখনোই একজন অফিস সহায়ক করতে পারেন না। যদি এ রকম হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, বালিগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। নামজারির সরকারি ফি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা এবং অফিসের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমনটাই দাবি তাঁদের।

পড়ুন : ৪৫ বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ, সুপারিশ পেলেন ১৭০২ জন

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন