চারদিকে নদীর পানি, মাঝে বিস্তীর্ণ বালুচর। দুর্গম পথ পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসে শিশুরা। দারিদ্র্য আর প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এসব শিশুর হাতে নতুন স্কুল ব্যাগ, খাতা ও কলম তুলে দেওয়ায় তাদের মুখে ফুটেছে আনন্দের হাসি। তবে চরের শিশুদের শিক্ষার এই পথ মসৃণ নয়। নদীভাঙনে বিদ্যালয় বিলীন হওয়া, মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগের অভাব আর দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুরই ঝরে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে রয়েছে বাল্যবিয়ের আশঙ্কাও।
এমন বাস্তবতায় কুড়িগ্রামের দুর্গম চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ভাসমান স্কুল প্রতিষ্ঠা, পর্যাপ্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণ এবং চরবাসীর জীবনমান উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের নেতারা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নের দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত দ্বীপচর রাউলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ, কুড়িগ্রামের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শতাধিক শিক্ষার্থীর হাতে নতুন স্কুল ব্যাগ, খাতা, কলমসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ তুলে দেন অতিথিরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যের হার বর্তমানে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জেলার সাড়ে ৮০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত চার শতাধিক চরের সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন জরুরি। চরাঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, জেলার ১ হাজার ২৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে নদীতীরবর্তী, চর ও দ্বীপচরে রয়েছে ১৬৯টি। নদীভাঙন এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে ওই এলাকার শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চরাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে দ্রুত ভাসমান স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, নদীভাঙন ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষাজীবন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলায় প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি চরাঞ্চলের উপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
মাধ্যমিক শিক্ষার সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক চরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর অনেক মেয়ের বাল্যবিয়ে হয়ে যায়, আর অনেক ছেলে পরিবারের জীবিকার তাগিদে উপার্জনের পথে নেমে পড়ে। চরে পর্যাপ্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বাল্যবিয়ে ও ঝরে পড়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে।
চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে পৃথক ‘চরবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনেরও দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, চরবাসীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও জীবিকার সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অধ্যক্ষ খাজা শরীফ উদ্দিন রিন্টু, যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল আখের, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক নাজমুন নাহার বিউটি, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু নোমান মো. নওশাদ এবং ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবক রফিউল হক, ক্রীড়া সংগঠক শাহনুর আশরাফ জুয়েল, ঘোগাদহ ইউনিয়ন চর উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি আব্দুল জলিল, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠান শেষে নতুন স্কুল ব্যাগ, খাতা ও কলম পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। দুর্গম চরাঞ্চলের এসব শিশুর কাছে শিক্ষা উপকরণ বিতরণের এই উদ্যোগ যেমন আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করেছে, তেমনি সামনে এসেছে তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।
চরের শিশুদের হাতে শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ ও ধারাবাহিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন বড় প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাসমান স্কুল, পর্যাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং চরাঞ্চলের উপযোগী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার আলো থেকে পিছিয়ে পড়া এসব শিশুর ভবিষ্যৎ বদলানোর পথ তৈরি হতে পারে।
পড়ুন : মন্ত্রীর পরিদর্শনের প্রেক্ষিতে কাজের মান বাড়ছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায়


