মাদরাসায় বলাৎকার ও অশালীন ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে ভবিষ্যতে এ জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি’র ত্রি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী বলেন, মাদরাসার মতো পবিত্র স্থানে যাতে কোনোভাবেই এ ধরনের অন্যায় ও গর্হিত কাজ না ঘটে, সে লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ইমামদের বক্তব্য প্রদানের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় দেশজুড়ে আগত ইমামদের সতর্ক করে ধর্মমন্ত্রী বলেন, কোনো অপশক্তি যেন উসকানি দিয়ে দেশের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। সমাজে ইমামদের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জুমার খুতবায় মাদক, সন্ত্রাসসহ নানা সামাজিক অপকর্মের বিরুদ্ধে জোরালো বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানান।
কাউন্সিল অধিবেশনে ইমাম সমিতির নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। এ সময় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাঁদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা দিক তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. শামীম কায়সার।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় অগ্রযাত্রায় আলেম-ওলামা ও ইমামদের ভূমিকা মূল্যায়ন, সমিতির সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। এর আগে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ফরহাদ আহমেদ কাউন্সিল আয়োজনের বিষয়ে নিশ্চিত করেছিলেন।
এদিকে মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনায় আলেম সমাজের নীরবতা নিয়ে চরম উদ্বেগ ও প্রশ্ন প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এই জাতীয় জঘন্য পাপের বিরুদ্ধে শীর্ষ আলেম ও জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তাদের প্রকাশ্যে মুখ খোলার ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দিবাগত রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আসিফ নজরুল এসব কথা তুলে ধরেন।
পোস্টে তিনি আলেম সমাজের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ও বিশেষ করে মাওলানা আহমাদুল্লাহর মতো আলেমদের মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসার পাশাপাশি কিছু শিক্ষকের এ ধরনের অপকর্মকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আলেমদের বাইরের একটি অংশ শিশুদের বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো কবিরা গুনাহে লিপ্ত, যার সংখ্যা নগণ্য নয়। হযরত লূত (আ.)-এর আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এসব অপরাধীদের কারণেই ঐ জাতিকে আল্লাহ কঠিন শাস্তি দিয়েছিলেন।
আসিফ নজরুল তাঁর পোস্টে আলেম সমাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখেন, ‘আমার খুব অবাক লাগে যে, এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনও সোচ্চার হতে দেখি না। খাবার, পোশাক, বিনোদন, বাক-স্বাধীনতা— নানা বিষয়েও তাঁরা ফতোয়া দেন। দু-একটি ক্ষেত্রে মব তৈরি করে মানুষকে হত্যা পর্যন্ত করা হয়। অথচ নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধের বিরুদ্ধে নেতৃস্থানীয় আলেম, জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা বা হুজুররা কেন সোচ্চার হতে পারেন না?’
তিনি আরও সতর্ক করে জানান যে, বাংলাদেশে নানা ধরনের ইসলামবিরোধী চক্রান্ত সত্ত্বেও মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণেই আলেম সমাজ সম্মানের আসনে রয়েছে। তবে নিজের গোষ্ঠীর অপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে উল্টো সহানুভূতি দেখালে তার দায় সার্বিকভাবে আলেম সমাজের ওপরই বর্তাবে। এর ফলে মানুষের শ্রদ্ধা কমে যাবে এবং বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পোস্টের শেষভাগে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আশা করি, অচিরেই আলেম সমাজের নেতৃত্বের ঘুম ভাঙবে। মাদ্রাসায় বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে কঠোর বক্তব্য তাঁদের কাছ থেকে শুনতে পাবো। অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাঁরা নিজেরাই সোচ্চার হবেন এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাবেন।’
পড়ুন : খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক অবরোধ চলছে
সা/


