অতীতের ‘ঘুণে ধরা ও বস্তাপচা’ রাজনীতি পরিহার করে দেশে অবিলম্বে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। বর্তমান সংবিধানের প্রতি সরকারের অতিমাত্রাকে তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিদ্যমান সংবিধান ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে এবং তা টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে। তাই সরকারকে অবিলম্বে ‘সংবিধানের নেশা’ থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘জুলাই সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই সভার আয়োজন করে।
বর্তমান সংবিধানের ওপর সরকারের অতি-নির্ভরশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতের আমির বলেন, “আপনারা এখন সংবিধান খুঁজছেন কেন? সংবিধান মেনেই তো সাড়ে ১৫ বছর সরকারের সদয় অনুমতি নিয়ে কিছু সভা-সমাবেশ ও মিছিল করেছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদকে তাড়াতে পারেননি।”
তরুণদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় “উই ওয়ান্ট জাস্টিস” স্লোগান উঠলেও দেশে এখনো প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং বৈষম্য দিন দিন আরও বেড়েছে। অতীতে বারবার সংবিধান সংশোধনের পর আদালতে তা বাতিলের নজির টেনে তিনি বলেন, পণ্ডশ্রম না করে আমূল সংস্কারের পথে হাঁটা উচিত এবং জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও গণভোটের রায় মানতে সরকার বাধ্য।
দেশের সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অর্থ, অস্ত্র ও মাদক প্রবেশ এবং লাগামহীন চাঁদাবাজি রোধে বর্তমান প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন শফিকুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এসব কর্মকাণ্ড ঠেকানোর সক্ষমতা যে সরকারের নেই, তাদের দেশ শাসনের অধিকারও নেই।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা দিয়ে মাদকের চালান আসা এবং সম্প্রতি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৫০টি ট্রাকে ডাকাতির ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির অভিযোগ তোলেন। এছাড়া রাজধানীর রাড্ডা মেডিকেল সেন্টারে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় কেবল অভিযুক্ত সংসদ সদস্যের পদত্যাগই যথেষ্ট নয়, বরং তাঁকে যথাযথ আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, পঞ্চগড়ে কৃষকেরা ন্যায্য দাম না পেয়ে পানির দরে লাউ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বা হাটে ফেলে দিচ্ছেন, অথচ রাজধানীতে সেই একই পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। পণ্যমূল্যের এই অতিরিক্ত দামের পেছনে চাঁদাবাজির বড় প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দুপুরের খাবারের মূল্য নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যাতে অন্তত শান্তিতে দুমুঠো ভাত খেতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল দায়িত্ব।
আলোচনা সভায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সংবিধান সংশোধনের নামে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সরকার জুলাই সনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা করছে। স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার মতো নতুন প্রস্তাব জুলাই সনদের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন তাঁর বক্তব্যে অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার সংস্কারের কোনো এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করতে চায় না। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর এবং গণভোটে অনুমোদনের পরও সরকার সংস্কার প্রস্তাবগুলো বিভিন্ন উপায়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সবমিলিয়ে, নিজেদের ব্যর্থতার দায় বিরোধীদের ওপর না চাপিয়ে বরং চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে কার্যকর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান বক্তারা।
পড়ুন : পতিত ফ্যাসিস্টদের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সা/


