প্রতিবাদের নীরব ভাষা থেকে রাষ্ট্রের আস্থার আসনে ড. শামীমা সুলতানা

সময় এক বিস্ময়কর জাদুকর। সে কখনো কখনো এমন কিছু দৃশ্যপট তৈরি করে, যা ইতিহাসের ক্যানভাসে সাহসের এক অমর তুলির আঁচড় হয়ে থেকে যায়। ক্ষমতার দম্ভের সামনে মাথা নত না করার যে গল্প আমরা বইয়ের পাতায় পড়ি, তা যখন বাস্তবে রূপ নেয়, তখন তা হয়ে ওঠে গোটা জাতির জন্য অনুপ্রেরণা। এমনই জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম ড. শামীমা সুলতানা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপকের গল্পটি কেবল একজন শিক্ষকের নয়, বরং আদর্শ, শেকড় এবং সাহসিকতার এক অনবদ্য আখ্যান।

যিনি একদিন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের পেশাগত জীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, সময়ের পালাবদলে আজ তিনি আসীন হয়েছেন রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ- বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট। দেশে তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ছে। চারদিকে থমথমে পরিস্থিতি, ভয় আর শঙ্কার দমবন্ধ করা পরিবেশ। ঠিক সেই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ভাইরাল হয়, যা মুহূর্তেই লাখো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, নাড়া দেয় বিবেককে।

ছবিতে দেখা যায়, ড. শামীমা সুলতানা তার বিভাগীয় কার্যালয়ের দেয়াল থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি নিজের হাতে সরিয়ে ফেলছেন। ক্ষমতার রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে একজন শিক্ষকের সেই নীরব অথচ জোরালো প্রতিবাদ সেদিন অনেককেই হতবাক করেছিল। এই দুঃসাহসের মাশুলও তাকে গুনতে হয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শো-কজ) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। চরম ঝুঁকিতে পড়ে যায় তার বর্ণাঢ্য পেশাগত জীবন।

কিন্তু ইতিহাস তো তার নিজস্ব গতিতেই চলে। মাত্র চারদিন পর, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে, সেই অহংকারী প্রশাসন নিজেদের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়।

ড. শামীমা সুলতানার প্রতিবাদী সত্তার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর চিন্তাশীল, মগ্ন গবেষকের মন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে দীর্ঘকাল ধরে তিনি জ্ঞান বিতরণের কাজ করে চলেছেন নীরবে। ২০২২ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে তিনি বাংলা বিভাগের সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবেও তিনি সফল।

শ্রেণিকক্ষের বাইরে মধ্যযুগীয় ও আধুনিক বাংলা সাহিত্য নিয়ে তার গবেষণার ব্যাপ্তি বিশাল। মঙ্গলকাব্য, চৌতিশা কিংবা ছোটগল্প নিয়ে তার কাজ বোদ্ধামহলে দারুণ প্রশংসিত। অমর মিত্র, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দিকপাল লেখকদের সাহিত্যকর্মের ওপর তার একাধিক গবেষণা প্রকল্প বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।

ড. শামীমার সাহস ও আদর্শবোধ হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা কোনো বিষয় নয়; এটি তার রক্তে মিশে থাকা উত্তরাধিকার। তিনি নেত্রকোনার পূর্বধলা ডিগ্রি কলেজের (বর্তবানে সরকারি কলেজ) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মরহুম প্রিন্সিপাল সিরাজুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার পিতা কেবল একজন শিক্ষানুরাগীই ছিলেন না, পূর্বধলা ও ধোবাউড়া আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং পূর্বধলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাবার সেই জনকল্যাণমুখী ও আপসহীন মানসিকতাই যেন আজ প্রতিফলিত হচ্ছে কন্যার মাঝে।

শিক্ষকতা, গবেষণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের যে দীর্ঘ পথ তিনি পাড়ি দিয়েছেন, তার এক সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এসেছে সম্প্রতি। রবিবার (২৫ অক্টোবর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ মেলে।

মহামান্য রাষ্ট্রপতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৮(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানাকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য পদে নিয়োগ প্রদান করেছেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে আগামী ৫ বছর বা তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত (এর মধ্যে যা আগে ঘটে) তিনি এই পদে বহাল থাকবেন।

সমাজের সকল স্তরের মানুষ- হোক সে সাধারণ ছাত্র, চাকরিপ্রার্থী তরুণ কিংবা বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবী- পিএসসি’র মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে সবার আগে যা প্রত্যাশা করে, তা হলো ‘স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা’। ড. শামীমা সুলতানার মতো একজন শেকড়সন্ধানী ও সাহসী শিক্ষাবিদ এই পদে আসীন হওয়ায় তরুণ প্রজন্মের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

যিনি নিজের আদর্শের প্রশ্নে ক্ষমতার সামনেও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেন, তিনি রাষ্ট্রের মেধা বাছাইয়ের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানেও সততা ও ন্যায্যতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন- সুধীজনের এটাই একান্ত প্রত্যাশা। সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে আসা জীবনবোধ আর রাজপথের প্রতিবাদের সাহস- এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ড. শামীমা সুলতানার আগামীর পথচলা হোক দেশের জন্য শুভ বারতা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : কালিয়াকৈরে বীর মুক্তিযোদ্ধার ৫ লাখ টাকা ছিনতাই

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন