জীবিকার তাগিদে প্রায় দেড় বছর ধরে গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহের কাজ করছিলেন ২৫ বছরের তরুণ মো. মোস্তাকিন। কিন্তু মাস দেড়েক ধরে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ থাকায় থেমে যায় তার চিরচেনা সেই রুটিন। তবুও হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ ছিল না; সংসারের চাকা সচল রাখতে মালিকের নির্মাণাধীন গরুর খামারের শেডে শ্রম দিচ্ছিলেন তিনি। সেই কর্মস্থলেই অপেক্ষা করছিল মর্মান্তিক এক পরিণতি। লোহার পাতে রঙের আঁচড় দিতে গিয়ে বিদ্যুতের প্রধান লাইনের স্পর্শে অকালেই নিভে গেল কর্মঠ এই তরুণের জীবনপ্রদীপ।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নেত্রকোনার হাওর উপজেলা খালিয়াজুরীর কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর বাজার এলাকায় হৃদয়বিদারক এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত মোস্তাকিন একই উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের আসদপুর গ্রামের মো. আজিমউদ্দিনের ছেলে। টগবগে তরুণের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আতাউর রহমানের বাড়িতে প্রায় দেড় বছর ধরে কর্মরত ছিলেন মোস্তাকিন। আতাউর রহমান পেশায় একজন গ্যাস সিলিন্ডারের এজেন্ট। সেই সুবাদে মোস্তাকিনের মূল কাজ ছিল গ্রাহকদের কাছে গ্যাস সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া। গত প্রায় দেড় মাস ধরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিকল্প কাজ হিসেবে আতাউর রহমানের নতুন গরুর খামারের জন্য নির্মিত শেডে কাজ করছিলেন তিনি।
সোমবার বিকেলে খামারের শেডের চালে উঠে লোহার পাতে রং করার কাজ করছিলেন মোস্তাকিন। ঠিক সে সময় অসাবধানতাবশত তার হাত শেডের ওপর দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের প্রধান সঞ্চালন লাইনের সংস্পর্শে চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যেই তীব্র বিদ্যুতের ঝটকায় চালা থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যান তিনি।
ঘটনার সময় বাড়ির মালিক আতাউর রহমান ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় এবং তার স্ত্রী চাকরিসূত্রে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে প্রশিক্ষণে অবস্থান করছিলেন। আতাউর রহমান জানান, মোস্তাকিন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও পরিশ্রমী কর্মী ছিলেন। রং করার সময় অসতর্কতাবশত প্রধান লাইনের তারে হাত লেগেই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাটি ঘটে।
মোস্তাকিনকে চালা থেকে ছিটকে পড়তে দেখে তার সহকর্মীরা দ্রুত ছুটে আসেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শাহীন আলম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খালিয়াজুরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাসির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ বিষয়টি আমলে নিয়েছে এবং নিহতের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। এ ঘটনায় নিহতের স্বজনদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ বা আপত্তি না থাকলে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
হাওরপাড়ের সাধারণ পরিবারের সন্তান মোস্তাকিনের অকাল প্রয়াণ কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে নির্মাণ ও সংস্কার কাজে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সামান্য অসাবধানতা আর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে ২৫ বছর বয়সেই থেমে গেল সম্ভাবনাময় এক তরুণের জীবন।
পড়ুন : টাঙ্গাইলে ৪১ বছর আগে স্বামীকে মিথ্যা হত্যা মামলার দায়ে স্ত্রীসহ ৩ জনের কারাদণ্ড


