গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি অনুসরণের নামে অনিয়ম, গ্রেডিং শিট ম্যানিপুলেশন, পূর্বনির্ধারিত পদায়ন এবং প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয়েছে।
কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) বিবেচনার পরিবর্তে প্রভাব ও পছন্দের ভিত্তিতে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওআমী লীগের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও অর্থায়নের বিনিময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে পদায়ন চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসবকিছুর পেছনে পতিত সরকারের আমলের কর্মকর্তারা ভূমিকা পালন করছেন।তারা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কমকর্তাদের বাসভবন ও কেপিআই স্থাপনাগুলোকে টার্গেটে পরিনত করছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর অত্মীয় ও বুয়েট ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতাকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এ পদায়ন করা হয়েছে। এর অধিনে রয়েছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ওয়ার্কিং ডিভিশন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন কাজ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের জাদুঘর । এ বিষয়ে নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, এসব কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জীবন নাশের কারিগর হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলীদের এ-প্লাস, এ, বি, সি ও ডি—এই পাঁচ ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হলেও এর লিখিত মানদণ্ড, মূল্যায়নপদ্ধতি ও অনুমোদনসংক্রান্ত নথি প্রকাশ করা হয়নি। একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে কর্মকর্তাদের নাম রেখে লটারিকে অতি সুক্ষ প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত করা হয়েছে। ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগের জন্য আগে থেকেই কর্মকর্তাদের নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, আহসান হাবীব, রেজা তাইমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের পদায়ন এবং ক্যাটাগরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
গ্রেডিং শিট ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, লটারির আগেই গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে আ ন ম মাজহারুল ইসলাম ও মো. জিয়াউর রহমানের মতো কর্মকর্তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব সারোয়ার আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, নির্বাহী প্রকৌশলী বিপ্লব এবং সংস্থাপন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজহার ও নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়ার ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে আ ন ম মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩, রেলওয়ে ডিভিশন ও প্রকল্প বিভাগ-৫-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি ২০০০-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এসব রাজনৈতিক যোগাযোগ তাঁর পদায়নে প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
মো. জিয়াউর রহমান সংস্থাপন-২-এ দায়িত্ব পালনের পর শেরে বাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এ পদায়ন পেয়েছেন। সংসদ ভবন ও এমপি হোস্টেলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্বে তাঁর পদায়নের যোগ্যতা, অনুমোদন এবং প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর অত্মীয় ও সাবেক বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এ সংযুক্ত করা হয়েছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়ে সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর অত্মীয় পরিচয়ে তিনি প্রথম পোস্টিং বাগিয়ে নেন নগর গণপূর্ত বিভাগে। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ওয়ার্কিং ডিভিশন হিসাবে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষন কাজ ।
ডিসেম্বর পরিকল্পনা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। এ সময় সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনসংশ্লিষ্ট স্থাপনা, এনএসআই ও দুদকের সদরদপ্তর এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পতিত রাজনৈতিক দলের নেত্রীর সম্ভাব্য আগমন, রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্র লীগ সংশ্লিষ্ঠদের পদায়নের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে ক্যাটাগরি নির্ধারণের নীতিমালা, গ্রেডিং শিট, লটারিতে ব্যবহৃত বাক্স ও নামের তালিকা, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, চূড়ান্ত পদায়ন আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট জনরা।
গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
গণপূর্ত কর্মকর্তা মাসুদ রানার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার এবং বদলি-বাণিজ্যের মাধ্যমে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট, বাড়ি, প্লট, দোকান, জমি, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থসহ শত কোটি টাকার কাছাকাছি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ ও বিভাগ-৪-এ দায়িত্ব পালনকালে উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের ভুয়া প্রাক্কলন তৈরি, টেন্ডারের গোপন তথ্য ফাঁস এবং কমিশনের বিনিময়ে ঠিকাদার নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দুদকে দাখিল করা হয়েছিল বলে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
রাজিবুল ইসলাম ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে মহাখালীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর আবার একই বিভাগে পদায়ন পেয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পদায়নের ধারাবাহিকতা ও বদলি নীতিমালা অনুসরণের বিষয়টি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
রেজা তাইমুর মালিক ঢাকা মেইনটেন্যান্স বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য লটারিতে নির্বাচিত হয়েছেন। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এর আগে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালনের পর তাঁকে এনএসআই সদরদপ্তর, দুদক সদরদপ্তর ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাই ও প্রশাসনিক বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না। তাঁর বাবা মো. রেজাউল হক মালিক (মুকুল) চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন বলে জানা গেছে।
রাশেদ আহসান সাবেক মন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ। ময়মনসিংহে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর মিরপুরে এবং বর্তমানে আজিমপুর-সংশ্লিষ্ট পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
লটারিতে বৈষম্য ও ১২০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
পূর্তভবন-সংশ্লিষ্ট পদে শামসুন্নাহার ঝুমার নাম লটারিতে উঠলেও একই পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাদের নাম কেন বাদ পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লিবনী জামানকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হলেও একই পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম লটারিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। একই পদমর্যাদার অর্ধশত কর্মকর্তা বহাল থাকা সত্ত্বেও কারা লটারির আওতায় এসেছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
লটারি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের একটি অংশের কথিত সিন্ডিকেট প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অর্থের পরিমাণ ও লেনদেনের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য মূল লেখায় নেই।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, সম্পদ কেনার উৎস এবং তাঁদের নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
গণপূর্তের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ শাখা গুলোতে ফ্যাসিস্টদের সাথে সম্পর্ক আছে এমন কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেয়া অত্যন্ত বিপদজনক মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক’(সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবন, ডিজিএফ আই প্রধানের বাসভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের বাসভবন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যদি কেনো আওয়ামী পন্থী আমলার হাতে থাকে তা সরকারের জন্য মোটেও মঙ্গলজনক না বরং এই প্রক্রিয়া ভয়ঙ্কর রুপ নিতে পারে। এখনি সরকারকে এবিষয়ে গভীর মনোযগী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একমাত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্য ছাড়া কারো জীবনের হুমকি আছে বলে আমি মনে করি না। একমাত্র তারেক রহমান ছাড়া কারো কিছু হবে না। কারণ এসব কর্মকর্তাদের যারা পোস্টিং দিয়েছেন তারা তো জেনে শুনেই দিয়েছেন। তারা তো তাদের বন্ধু। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী যারা পোস্টিং দিয়েছেন, তারা তো ৫বছরের শিশু না। তারা যখন পোস্টিং দিয়েছেন তখন আপনাকে মনে করতে হবে তাদের সাথে আওয়ামী লীগের সক্ষ্যতা আছে, বন্ধুত্ব আছে। আর বন্ধু তো বন্ধুর কখনো জীবন কেঁড়ে নিবে না। তাই আমি মনে করি তারেক রহমান ছাড়া কারো জীবনের হুমকি নেই এবং এসব পদায়ন ও কর্মকাণ্ড পরিকল্পিত।
পড়ুন : সীতাকুণ্ডে লরিচাপায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৫ যাত্রী নিহত


