গির্জায় হামলার জেরে সিরিয়ায় জর্ডানের ভয়াবহ বিমান হামলা, নিহত ৭

জর্ডানের একটি গির্জায় প্রাণঘাতী হামলার জবাবে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলা চালিয়েছে জর্ডানের সামরিক বাহিনী। সোমবার (২৬ অক্টোবর) চালানো এ হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু ও একজন নারী রয়েছেন। হামলার পর জর্ডানের সঙ্গে প্রধান সীমান্ত পারাপারের পথ নাসিব বন্ধ করে দিয়েছে সিরিয়া। এতে দুই দেশের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

জর্ডানের সামরিক বাহিনীর দাবি, গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দেশটির কারাক এলাকায় একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলার জবাবে দক্ষিণ-পূর্ব সিরিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আস্তানা লক্ষ্য করে এ অভিযান চালানো হয়। তবে সিরিয়া সরকার দাবি করেছে, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় না করেই জর্ডান এ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে দামেস্ক।

সিরিয়ার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যায় দেশটির দেরা ও সুয়েইদা প্রদেশের গ্রামীণ এলাকায় অন্তত চারটি স্থানে হামলা চালানো হয়। এতে সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিন পুরুষ, একজন নারী ও তিন শিশু রয়েছেন। হামলায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সিরিয়ার দেরা প্রদেশের আল-তাই গ্রামে একটি তাঁবুতে বিমান হামলায় একই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে একজন পুরুষ, একজন নারী ও তিন শিশু রয়েছেন। এ ঘটনায় পরিবারের আরও তিন সদস্য আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজন শিশুও রয়েছে।

এ ছাড়া দেরা প্রদেশের আল-শাইয়া এলাকায় চালানো আরেকটি হামলায় ৮০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হন। একই প্রদেশের মুজাইরিব শহরের আইন আল-বাসাল এলাকায় একটি আবাসিক ভবনেও হামলা চালানো হয়। তবে সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, সুয়েইদা প্রদেশের শাহবা শহরের একটি আবাসিক ভবনে হামলায় ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হন। এসব হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, অভিযানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন। এ ছাড়া তাদের ব্যবহৃত একাধিক যানবাহন ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। তবে হতাহতদের পরিচয় ও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা যায়নি।

জর্ডানের সামরিক বাহিনীর দাবি, সিরিয়া সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই দক্ষিণ-পূর্ব সিরিয়ায় এ অভিযান চালানো হয়েছে। তবে সিরিয়া সরকার এ দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। দেশটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দামেস্ককে আগে থেকে কোনো তথ্য না জানিয়েই এবং কোনো ধরনের সমন্বয় ছাড়াই জর্ডান এ হামলা চালিয়েছে।

সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ ঘটনাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে এ ঘটনার পরিণতি মোকাবিলার চেষ্টা করবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

হামলার পর সিরিয়ার কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, অভিযানের বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়ার ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্বসম্মতি ও সমন্বয়ের প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিমান হামলার পর জর্ডানের সঙ্গে সিরিয়ার প্রধান সীমান্ত পারাপারের পথ নাসিব বন্ধ করে দিয়েছে সিরিয়ার সীমান্ত কর্তৃপক্ষ। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

নাসিব সীমান্ত পারাপারের পথ জর্ডান ও সিরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন এবং যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দুই দেশের মধ্যে যাত্রী ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের একমাত্র সীমান্ত পারাপারের পথ হওয়ায় এর কার্যক্রম বন্ধ থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতে প্রভাব পড়তে পারে।

সীমান্ত বন্ধের সিদ্ধান্তের ফলে পণ্য পরিবহন কত দিন বন্ধ থাকবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সামরিক হামলার পর সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে, গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে দুই ভাই ও তাঁদের ভগ্নিপতিকে গ্রেপ্তার করেছে জর্ডানের নিরাপত্তা বাহিনী। সোমবার আল-জাদিদা গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির পর তাঁদের আটক করা হয়।

জর্ডান সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। এ সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা গুরুতর আহত হন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত এবং হামলার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

গত শুক্রবার রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে কারাক এলাকার একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া মানুষের ওপর তিন বন্দুকধারী গুলি চালায়। ওই ঘটনায় অন্তত নয়জন নিহত হন এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হন।

ঘটনাটি জর্ডানে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে এমন প্রাণঘাতী হামলার পর দেশটির সরকার দায়ীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেয়।

গির্জায় হামলার পর জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।

জর্ডানে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ মানুষের মধ্যে আনুমানিক ৩ লাখ খ্রিষ্টান। কারাক এলাকায়ও সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ফলে গির্জায় হামলার ঘটনাটি শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতি নয়, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর সুরক্ষার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

পড়ুন:ইসরায়েলে আজ ভোট, নেতানিয়াহুর পরাজয় নাকি উত্থান?

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন