জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ, বন্যা, জলাবদ্ধতা, পানিবাহিত রোগ এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকটে বাংলাদেশের শিশুরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে নগরের বস্তি এলাকার নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা এসব ঝুঁকিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২৪ সালে জলবায়ু-সম্পর্কিত বিভিন্ন কারণে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন (সিডব্লিউএফ), বারসিক ও এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্কের (ইআইআরএন) গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টারের আজিমুর রহমান কনফারেন্স রুমে চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে নগরের শিশু স্বাস্থ্য: সংকট ও সমস্যা সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন
মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী শাহ ইসরাত আজমেরী। এতে সভাপতিত্ব করেন চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তরুণদের মধ্যে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা জলবায়ু পরিবর্তন, শিশুস্বাস্থ্য ও নগরায়ণজনিত সমস্যা মোকাবিলায় কাজে লাগানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং কমিউনিটির সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, সব বিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের সক্ষমতা না থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী ভিজিটিং চিকিৎসক ও মোবাইল নার্সিং সেবার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা প্রয়োজন। এ বিষয়ে কাজ করার মতো বিশেষজ্ঞ, জনবল ও তরুণ প্রজন্মের সদিচ্ছা রয়েছে। এসব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে একটি স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গড়ে তোলা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশদূষণ রোধে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি করার পাশাপাশি তা রক্ষার দায়িত্বও নিজেদের নিতে হবে। ঘর থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি পর্যায়ে পরিবেশ সুরক্ষার চর্চা গড়ে তুলতে হবে।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আনিসুর রহমান খোকন বলেন, প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশবিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এ জন্য বিদ্যালয়ে পরিবেশবিষয়ক পাঠদানের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। শৈশবে শেখা মূল্যবোধ ভবিষ্যৎ জীবনেও প্রভাব ফেলে।
মূল প্রবন্ধে শাহ ইসরাত আজমেরী বলেন, নগরের বস্তি এলাকার অপর্যাপ্ত আবাসন, দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, অনিরাপদ পানি এবং সীমিত স্যানিটেশন সুবিধা শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। তাপপ্রবাহের সময় টিনের ঘরে অতিরিক্ত গরম এবং জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ শিশুদের পানিশূন্যতা, ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
তিনি জানান, ২০২৫ সালে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের জরিপে অংশ নেওয়া ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ বস্তির পরিবার শিশুদের পরিবারের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাপমাত্রার প্রবণতা বিশ্লেষণে ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা স্থায়ী হওয়ার সময়কাল বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় দীর্ঘস্থায়ী তাপের বিস্তার ও তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।
গবেষণায় বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু শিশুদের স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুদের সুরক্ষায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, বস্তি এলাকায় উন্নত পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, তাপপ্রবাহের সময় ছায়াযুক্ত স্থান ও পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা করা এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।
পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগের সময় শিশুদের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে রাজধানীর স্কলার্সটিকা স্কুলের শিক্ষার্থী জায়রা রহমান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করা, দুর্যোগের সময় শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা এবং বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তাপপ্রবাহের সময় শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অনলাইন ক্লাসের সুযোগ বাড়ানোরও সুপারিশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ক্লাইমেটের পরিচালক ও ইউনেস্কো চেয়ার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুন্নবী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন, অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন ফারুকী, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পড়ুন : জাতীয় গ্রিড পুনরুদ্ধার শেষ, পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ
সা/


