শরতের বিকেলে এক টুকরো সবুজ মাঠ যেন পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। চারপাশে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মাঠের চারপাশ ছাড়িয়ে আশপাশের বাড়ির ছাদ আর গাছের ডালেও তখন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের ভিড়। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর খেলার মাঠটি শনিবার (৩১ অক্টোবল) বিকেলে এমনই এক উৎসবমুখর ও শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালের সাক্ষী হলো। সমর রামচন্দ্রপুর সূর্য তরুণ সংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিত জমজমাট ফুটবল টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত লড়াইয়ে মদন উপজেলাকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে শিরোপা ঘরে তুলেছে কেন্দুয়া পৌরসভা।
বিকেল ৩টায় রেফারির বাঁশি বাজার সাথে সাথেই শুরু হয় দুই দলের মর্যাদার লড়াই। ফাইনালের মূল আকর্ষণ ছিল দুই দলেই ভিনদেশি ফুটবলারদের সরব উপস্থিতি। কেন্দুয়া পৌরসভার জার্সিতে মাঠে নামেন পাঁচজন নাইজেরিয়ান ও একজন মিশরীয় খেলোয়াড়। অন্যদিকে পিছিয়ে ছিল না মদন উপজেলাও; তাদের হয়ে মাঠ কাঁপাতে নামেন ছয়জন আফ্রিকান ফুটবলার। তবে সবার নজর কেড়ে নেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ‘ভাইরাল’ ফুটবলার মোস্তফা মিশরি। কেন্দুয়ার হয়ে মাঠে নেমে দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করে বলও জড়ান প্রতিপক্ষের জালে।
খেলার প্রথমার্ধ ছিল আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের এক ধ্রুপদী প্রদর্শনী। দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যে কেউ কাউকে এক চুলও ছাড় দিতে নারাজ। টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে প্রথমার্ধ শেষ হয় ২-২ গোলের সমতায়।
বিরতির পর জয়ের নেশায় মরিয়া হয়ে ওঠে দুই দলই। ঠিক তখনই জ্বলে ওঠেন ঘরের ছেলে ও ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের স্ট্রাইকার আরিফ হোসেন (আরিফুল ইসলাম)। দ্বিতীয়ার্ধে তার করা দুর্দান্ত এক গোলেই লিড নেয় কেন্দুয়া পৌরসভা। শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত মদন উপজেলা বারবার আক্রমণে গিয়েও আর সমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে ৫ গোলের এই থ্রিলার ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে কেন্দুয়া পৌরসভা। ফাইনাল ম্যাচে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হন নভেল এবং পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ খেলে ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’ বা সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন জয়সূচক গোলদাতা আরিফুল ইসলাম।
খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে ৮০ হাজার এবং রানার আপ দলের হাতে ২০ হাজার টাকার প্রাইজমানি ও ট্রফি তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব রফিকুল ইসলাম হিলালী। টুর্নামেন্টের আয়োজক হেলিম জানান, ফাইনাল খেলাটি উপভোগ করতে এদিন মাঠে ও আশপাশের এলাকায় লক্ষাধিক দর্শকের সমাগম ঘটেছিল।
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সানজিদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পুরস্কার বিতরণী পর্বে বিপুল সংখ্যক দর্শককে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে খেলা উপভোগ করার জন্য ধন্যবাদ জানান এমপি রফিকুল ইসলাম হিলালী। এ সময় স্থানীয় ক্রীড়ামোদীদের জন্য আনন্দের সুসংবাদ দেন তিনি। সংসদ সদস্য তার বক্তব্যে বলেন, সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে আধুনিক খেলার মাঠ তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং মাসকা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী রামচন্দ্রপুর গ্রামের মাঠটি অবশ্যই সেই সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এমপির ঘোষণার সাথে সাথেই উপস্থিত লক্ষাধিক দর্শকের করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ও অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দুয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈম-উল ইসলাম চৌধুরী, কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ তরিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া, সিনিয়র সহসভাপতি মো. হাবিবুর রহমান মোসলেম, সাধারণ সম্পাদক মো. মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মজনু, সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন খোকন, পৌর বিএনপির সভাপতি খোকন আহমেদ ডিলার এবং সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন খান।
এ ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর শহরের নানা স্তরের রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ উপস্থিত থেকে এই ক্রীড়া উৎসবকে সাফল্যমণ্ডিত করে তোলেন। গ্রামীণ জনপদে এমন বর্ণিল আয়োজন ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
পড়ুন : টাঙ্গাইলে সেই মেধাবী শিক্ষার্থী নিহত রাকিবুল পেল জিপিএ-৫


