সীমান্তজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চোরাচালান রোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ধারাবাহিক তৎপরতায় নেত্রকোনা সীমান্তে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। সদ্য সমাপ্ত অক্টোবর মাসে জেলার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় দিনরাত অভিযান চালিয়ে এএক কোটি তেরো লক্ষ তেষট্টি হাজার দুইশত ষোল টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মাদক, গবাদিপশু ও বিচিত্র ধরনের চোরাচালানি পণ্য জব্দ করেছে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি)। পাশাপাশি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে এক মানব পাচারকারীসহ তিনজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ৩১ বিজিবি’র অধিনায়ক ও পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল বারী (পিএসসি) কর্তৃক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মাসব্যাপী অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পুরো মাসে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ বিভিন্ন বর্ডার অবজারবেশন পোস্টের (বিওপি) জওয়ানরা দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় ১৪২টি ঝটিকা ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন। সীমান্তের দুর্গম পথ ও কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে বিজিবির তীক্ষ্ণ নজরদারির ফলে চোরাচালানি চক্রের হাত থেকে এসব বিপুল পরিমাণ মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
জব্দকৃত পণ্যের বৈচিত্র্য ও বাজারমূল্য বিজিবির দেওয়া জব্দকৃত মালামালের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চোরাকারবারিরা ভারী খনিজ সম্পদ থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, প্রসাধনী এমনকি মুখরোচক খাবারও অবৈধ পথে পারাপারের চেষ্টা চালিয়েছে। মাসব্যাপী অভিযানে জব্দকৃত পণ্যের মধ্যে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বড় চালানটি ছিল ভারতীয় কয়লার। বিজিবি সদস্যরা ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার ১৭০ টাকা মূল্যের এক লাখ ৮১ হাজার ৮৮৮ দশমিক পাঁচ কেজি ভারতীয় কয়লা জব্দ করতে সক্ষম হন।
এছাড়া শীত মৌসুমকে সামনে রেখে চোরাই পথে আনা ২৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের ৫৩৩টি ভারতীয় কম্বল এবং ২০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা মূল্যের ২৬টি ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৫৭ বোতল ভারতীয় মদ, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ছয় লাখ ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা।
প্রসাধনী ও গৃহস্থালি পণ্যের মধ্যে রয়েছে নয় লাখ ১২ হাজার ৯৭৬ টাকা মূল্যের নয় হাজার ১০২টি ভারতীয় কসমেটিকস, পাঁচ লাখ ৩২ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের ১১ হাজার ৯০০টি ভারতীয় বাঁশ, ৮০ হাজার ২০০ টাকার ৩৮০ পাতা বিভিন্ন প্রকার ওষুধ এবং ১০ হাজার ৪০০ টাকা মূল্যের ১৬ পিস ভারতীয় কোদাল।
নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও মসলার তালিকাও বেশ দীর্ঘ। অভিযানে এক লাখ ৮২ হাজার ৮৫০ টাকার এক হাজার ২১৯ কেজি ভারতীয় চিনি, এক লাখ পাঁচ হাজার টাকার ৭০০ কেজি ভারতীয় টমেটো, ২০ হাজার ৩০০ টাকার ২৯ কেজি ভারতীয় জিরা এবং তিন হাজার ৬০০ টাকার ৬০ কেজি ভারতীয় লেবু জব্দ করা হয়। এছাড়াও ৩৬ হাজার ১৮০ টাকার ১৭৮ প্যাকেট ভারতীয় চকলেট, ৩৬ হাজার ১৬০ টাকার ১১৩ কেজি ভারতীয় ফুচকা, ১০ হাজার ৮০ টাকার ৬৯ প্যাকেট ভারতীয় শোনপাপড়ি এবং ৬৮০ টাকার ৩৪ প্যাকেট ভারতীয় বিস্কুট রয়েছে এই তালিকায়।
শুধু ভারত থেকে আসা পণ্যই নয়, দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচারের সময় দুই লাখ ৯৬ হাজার ৩২০ টাকা মূল্যের দুই হাজার ৯৬ কেজি বাংলাদেশি রসুন এবং ৯০ হাজার ২০০ টাকা মূল্যের ২৬৭ কেজি বাংলাদেশি মাছও জব্দ করেছে বিজিবি। চোরাচালান কাজে ব্যবহৃত এক লাখ টাকা মূল্যের একটি প্লাটিনা মোটরসাইকেল এবং পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের একটি ঠেলাগাড়িও জব্দ করা হয়েছে।
বিজিবি জানায়, উদ্ধারকৃত ৪৫৭ বোতল ভারতীয় মদ ইতোমধ্যে নেত্রকোনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে এবং অন্যান্য সকল চোরাচালানি মালামাল সরকারি বিধি মোতাবেক নেত্রকোনা কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পণ্য চোরাচালান রোধের পাশাপাশি মানব পাচার প্রতিরোধেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে ৩১ বিজিবি। অক্টোবর মাসে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের অপরাধে একজন মানব পাচারকারী এবং দুইজন বাংলাদেশি নাগরিককে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরবর্তীতে গত ১০ অক্টোবর দুর্গাপুর থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করে আটককৃতদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী জানান, দেশের অর্থনীতি সুরক্ষা এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিজিবির নিয়মিত অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সব ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও চোরাচালান সমূলে নির্মূল করতে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
পড়ুন : রূপগঞ্জে ৬৪২ বোতল ফেনসিডিয়ালসহ ২ মাদককারবারি গ্রেফতার


