চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭ দশমিক ০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১৬ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৯৬ কোটি ডলার। এই প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে তৈরি পোশাক খাত। পাশাপাশি পাট, চামড়া ও রাসায়নিক পণ্য রপ্তানিতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য চার মাসে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক খাত। বিশেষ করে নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি আয় বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার।
নিটওয়্যার ও ওভেন পোশাক মিলিয়ে প্রথম চার মাসে মোট রপ্তানি আয় এসেছে ১৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। যা দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের রপ্তানি খাত এখনো তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সামগ্রিক রপ্তানি আয় বৃদ্ধির প্রায় ৮১ শতাংশ অবদানও এসেছে এ খাত থেকে।
তবে এবারের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির চিত্রে পোশাকশিল্পের বাইরের কয়েকটি খাতের অগ্রগতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতে রপ্তানি আয় ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৩৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আলোচ্য সময়ে এ খাতের রপ্তানি আয় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে রাসায়নিক পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। শতাংশের হিসাবে রাসায়নিক পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া হোম টেক্সটাইল ও পাদুকা রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। প্রথম চার মাসে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে, পাদুকা রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব খাতের অগ্রগতি দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করছে।
তবে সব খাতে প্রবৃদ্ধির চিত্র এক রকম নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতে আয় কমেছে। এর মধ্যে কৃষিপণ্য রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি আয় কমেছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। পাশাপাশি তুলা ও তুলাজাত পণ্যের রপ্তানিতেও ১০ দশমিক ২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক রপ্তানি আয় বাড়লেও এসব খাতের দুর্বলতা নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনো তৈরি পোশাকশিল্পনির্ভর হওয়ায় অন্যান্য খাতের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের গুণগত মান এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পাট, চামড়া, পাদুকা, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য ও রাসায়নিক পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে পণ্য রপ্তানি আয়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে। তবে এই অগ্রগতিকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই করতে হলে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং পিছিয়ে থাকা খাতগুলোর সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে।
পড়ুন:শক্তি বাড়িয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে ‘মুরাসু’, সর্বশেষ যা জানা গেল
ইমি/


