বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে কেন্দ্র করে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, আন্দোলন, সংঘাত ও সংকটের স্থায়ী সমাধানে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা রক্ষা করতে হবে এবং শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকারের ব্যর্থতা শিল্প খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এ আহ্বান জানান।
মঞ্জু বলেন, শ্রমিকের অধিকার এবং পোশাকশিল্পের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিককে ন্যায্য মজুরি দিতে হবে, একই সঙ্গে শিল্পের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সক্ষমতাও রক্ষা করতে হবে। তবে শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কাজেই পোশাকশিল্পের সংকট শুধু মালিকদের ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি ও লাখ লাখ পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন। দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিকে তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও অর্থায়নের খরচ বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের ন্যায্য মূল্য দিচ্ছে না। ফলে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির পুরো চাপ শুধু কারখানার মালিকদের ওপর ছেড়ে দিলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো সংকটে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায় নিতে হবে।
শ্রমিক অসন্তোষ মোকাবিলায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভূমিকার সমালোচনা করে এবি পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্ব নয়। দেশে পুলিশ, শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও বিএনপির নেতাকর্মীদের লাঠিসোঁটা নিয়ে রাজপথে নামতে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের উপস্থিতির খবরও এসেছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন? এই একই ভুল আওয়ামী লীগও করেছিলো। শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের নামে রাজনৈতিক কর্মীদের মাঠে নামানো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে এবং নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে। বিএনপি বিরোধী দলে থাকার সময় যে নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি করেছিল, এখন তাদের সেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপি গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছিল। অন্যদিকে এর আগে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী বর্তমান পরিকল্পনা প্রতি মন্ত্রী জোনায়েদ সাকি ২৫ হাজার টাকা মজুরির দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এখন শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবির বিষয়ে তাদের অবস্থান কী, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বিরোধী দলে থাকলে শ্রমিকের অধিকারের পক্ষে কথা বলা আর ক্ষমতায় এসে সেই প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান নেওয়া উচিত নয়।
মজুরি বোর্ড গঠন ও সরকারের উদ্যোগের বিলম্বের সমালোচনা করে মঞ্জু বলেন, ১৫ অক্টোবর মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড গঠন করতে ১ নভেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে। প্রথম সভা হয়েছে ৪ নভেম্বর। শ্রমিক অসন্তোষ বাড়তে থাকার মধ্যে এতদিন কার্যকর আলোচনা ও সমাধানের উদ্যোগ না নেওয়া সরকারের সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। শ্রমিকদের দাবি ও অসন্তোষকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন।
গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে তিনি বলেন, এই মৃত্যুর জন্য কারা দায়ী, শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কারা জড়িত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে কি না, তা তদন্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুপ্রবেশ, উসকানি, ভাঙচুর বা নাশকতার অভিযোগ থাকলে সেগুলোও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। কোনভাবেই নৈরাজ্য, গাড়ী ভাঙচুর, প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর গ্রহনযোগ্য নয়। এর সাথে যারা জড়িত তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
শ্রম বিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমানের সঞ্চালনায় এবি পার্টির পক্ষে কিছু দাবি পেশ করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির পক্ষ থেকে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান বর্তমান মজুরি বোর্ডকে কার্যকর করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ চূড়ান্ত করা ও শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য মজুরি বৃদ্ধির রোডম্যাপ ঘোষণা করা। প্রয়োজনে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হলেও প্রতিটি ধাপের পরিমাণ ও কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করার দাবি জানানো হয়।
ব্যারিস্টার নোমান আরো বলেন,শ্রমিকের মজুরি কমিয়ে কিংবা আন্দোলন দমন করে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আবার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মধ্য দিয়েও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক মজুরি, দায়িত্বশীল মালিকানা, দক্ষ ও উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি এবং জবাবদিহিমূলক সরকার।
এবি পার্টি সংকট তৈরি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর রাজনীতি নয়, সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সমাধানের রাজনীতি চায়। শ্রমিকের মর্যাদা, শিল্পের সুরক্ষা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় পোশাকশিল্প ও শ্রমনীতি প্রণয়ন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এবিএম খালিদ হাসান, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, শ্রমিক পার্টির সমন্বয়ক জামাল শেখ,ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব বারকাজ নাসির আহমদ,সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হালিম নান্নু, মোহসীনুল হক চৌধুরী, মশিউর রহমান মিলু, শ্রমিক নেত্রী বেবি পাঠান গাইবান্ধা জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক তাজুল ইসলাম,রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী এবং পল্টন থানার সদস্য আব্দুল কুদ্দুস।
পড়ুন : সরকারের প্ল্যান শুধু দফায় দফায় সবকিছুর দাম বাড়ানো: মজিবুর রহমান মঞ্জু


