সীমান্তের কাঁটাতারে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ, ৫০ বছর পর বাবাকে শেষবার দেখলেন মেয়ে

সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল রক্তের সম্পর্কের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল দুই দেশের সীমান্ত, আর দুই পাশে ছিল একটি পরিবারের বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস। প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর পর বাবাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পেলেন বাংলাদেশে বসবাসরত শতবর্ষী বৃদ্ধের বড় মেয়ে ফিরদৌসী খাতুন। বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে শেষ বিদায় জানাতে সীমান্তের শূন্যরেখায় ছুটে যান তিনি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে মেহেরপুরের মুজিবনগর স্বাধীনতা সড়কের ১০৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে বেলতলায় ঘটে এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন পর বাবাকে সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফিরদৌসী খাতুন। বাবাকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি জীবনের শেষ মুহূর্তে তাঁকে একনজর দেখতে পাওয়ার আকুতি ছিল তাঁর চোখেমুখে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিশেষ উদ্যোগে সীমান্তের শূন্যরেখায় বাবাকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান তিনি। এ সময় তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।

প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর আগে ইসরাফিলের সঙ্গে বিয়ের পর বাংলাদেশে সংসার শুরু করেন ফিরদৌসী খাতুন। বিয়ের পর থেকে দুই দেশের সীমান্তের কারণে ধীরে ধীরে বাবার বাড়ির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে আসে। পরবর্তী সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হলে সেই যোগাযোগ কার্যত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একসময় যে বাবার হাত ধরে বেড়ে উঠেছেন, সেই বাবার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে সরাসরি দেখা করার সুযোগ হয়নি তাঁর।

সময়ের ব্যবধানে দুই দেশের নাগরিকত্ব ও সীমান্তের ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁদের পারিবারিক সম্পর্কের স্বাভাবিক যোগাযোগে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাবার জীবদ্দশায় আর দেখা হবে কি না, সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়। অবশেষে বাবার মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছায় বাংলাদেশে থাকা মেয়ের কাছে। প্রিয় বাবাকে জীবনের শেষবারের মতো একনজর দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে পরিবারের পক্ষ থেকে সীমান্তে সাক্ষাতের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরিস্থিতি বিবেচনায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে সীমান্তের শূন্যরেখায় এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মুজিবনগর কোম্পানি সদর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার এনায়েত হোসেন। অন্যদিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ছয় সদস্যের একটি দল সেখানে উপস্থিত ছিল। ভারতীয় দলের নেতৃত্ব দেন এএসআই সুনীল কুমার।

দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে নির্ধারিত স্থানে বাবাকে শেষবারের মতো দেখেন ফিরদৌসী খাতুন। দীর্ঘ কয়েক দশক পর বাবার মুখ দেখার এই সুযোগ তাঁর কাছে ছিল জীবনের এক আবেগঘন মুহূর্ত। তবে এই সাক্ষাতের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ, যোগাযোগহীনতা আর প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা।

সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া হয়তো দুই দেশের ভূখণ্ডকে আলাদা করেছে, কিন্তু রক্তের সম্পর্ককে আলাদা করতে পারেনি। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর বাবাকে শেষবারের মতো দেখার এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, পারিবারিক বন্ধনের কাছে ভৌগোলিক দূরত্ব কতটা অসহায়। জীবনের শেষ বিদায়ে বাবাকে একনজর দেখতে পাওয়াটুকুই এখন ফিরদৌসী খাতুনের কাছে হয়ে থাকল অমূল্য স্মৃতি।

পড়ুন : মোংলায় আরও শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে: প্রধানমন্ত্রী

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন