নেত্রকোনা সীমান্তে প্রায় সোয়া ১৪ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্য ও মাদক জব্দ

উত্তরের পাহাড়ি জনপদ নেত্রকোনায় কেবলই নামতে শুরু করেছে হেমন্তের কুয়াশা। দরজায় কড়া নাড়ছে শীত। আর ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণকেই নিজেদের অবৈধ বাণিজ্যের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়েছে সীমান্তের চোরাকারবারি চক্র। গরম কাপড় থেকে শুরু করে খনিজ সম্পদ ও মাদক- অবৈধ পথে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে ঢোকানোর অপতৎপরতা রুখে দিতে নিশ্ছিদ্র প্রহরায় রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোনা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে ধারাবাহিক ও সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ১৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ চোরাচালানকৃত পণ্য জব্দ করেছে নেত্রকোনা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি)।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ৩১ বিজিবি’র অধিনায়ক ও পরিচালক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী (পিএসসি) তার ব্যাটালিয়নের আওতাধীন বিভিন্ন বর্ডার অবজারবেশন পোস্ট (বিওপি) অভিযানগুলোর বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুর থেকে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভোর পর্যন্ত সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি পথ ও নদী অববাহিকায় ১১টি পৃথক অভিযান পরিচালিত হয়।

শীত মৌসুমকে সামনে রেখে সীমান্তে সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা গেছে ভারতীয় কম্বল পাচারে। বিজিবির তথ্যমতে, ১১টি অভিযানের মধ্যে ৬টিই ছিল কম্বল আটকের ঘটনা, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য আট লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটায় কচুগড়া বিওপির টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৮০/এমপি হতে তিনশো গজ ভেতরে বনবেড়া এলাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ১০ পিস কম্বল জব্দ করে। এর ঠিক ১০ মিনিট পর দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে ভরতপুর বিওপির সদস্যরা সীমান্ত পিলার ১১৬৫/৫-এস হতে একশো গজ ভেতরে কালিকাপুর স্থান থেকে ৩০ হাজার টাকা মূল্যের আরও ছয় পিস কম্বল আটক করে।

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে চোরাকারবারিদের তৎপরতা বাড়লে বিজিবিও তাদের টহল জোরদার করে। বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় বিজয়পুর বিওপির টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৫০/এমপি হতে চারশো গজ অভ্যন্তরে কমলাবাড়ী নামক স্থান থেকে দুই লাখ টাকা মূল্যের ৪০ পিস ভারতীয় কম্বল জব্দ করে। পরদিন শুক্রবার ভোররাত ৩টায় চারুয়াপাড়া বিওপির সদস্যরা সীমান্ত পিলার ১১৪৩/৮-এস হতে দুইশো গজ ভেতরে সিকদারপাড়া এলাকা থেকে ৩৫ হাজার টাকা মূল্যের সাত পিস এবং ভোর ৩টা ৪০ মিনিটে বিজয়পুর বিওপি সীমান্ত পিলার ১১৫২/এমপি হতে পাঁচশো গজ ভেতরে কয়লারপোর্ট এলাকা থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের ৪৪ পিস কম্বল আটক করে। কম্বলের সবচেয়ে বড় চালানটি ধরা পড়ে ভোর ৪টায়; মাধুপাড়া বিওপির টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৪৭/এমপি হতে পাঁচশো গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে খোজিগড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন লাখ টাকা মূল্যের ৬০ পিস ভারতীয় কম্বল জব্দ করতে সক্ষম হয়। সব মিলিয়ে ১৬৭ পিস উন্নতমানের ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়েছে।

শুধু স্থলপথই নয়, নদীপথ ব্যবহার করেও প্রাকৃতিক সম্পদ পাচারের চেষ্টা চালিয়েছে অসাধু চক্র। শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে সীমান্তের অপরূপ সোমেশ্বরী নদীতে একযোগে দুটি সফল অভিযান চালায় বিজিবি। বিজয়পুর বিওপির টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৫২/এমপি হতে আটশো গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সোমেশ্বরী নদী থেকে মালিকবিহীন অবস্থায় আট হাজার কেজি ভারতীয় কয়লা এবং পাচারকাজে ব্যবহৃত তিনটি নৌকা জব্দ করে, যার সিজার মূল্য দুই লাখ ২০ হাজার টাকা।

একই সময়ে (ভোর ৫টায়) ভবানীপুর বিওপির সদস্যরা সীমান্ত পিলার ১১৫৩/এমপি হতে পাঁচশো গজ ভেতরে সোমেশ্বরী নদীর অপর এক পয়েন্ট থেকে সাত হাজার ৩৬০ কেজি ভারতীয় কয়লা এবং ৫৪০ পিস বাঁশ আটক করে। জব্দকৃত কয়লা ও বাঁশের আনুমানিক বাজারমূল্য এক লাখ ৫৮ হাজার টাকা। দুই অভিযানে ১৫ হাজার ৩৬০ কেজি (১৫ টনের বেশি) কয়লা জব্দ করা হয়েছে।

চোরাচালান চক্রের হাত থেকে বাদ যায়নি গবাদিপশু, মাদক এবং দেশীয় কৃষিপণ্যও। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় ভরতপুর বিওপির টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৬৮/৫-এস হতে দেড়শো গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভরতপুর এলাকা থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্যের দুইটি ভারতীয় গরু আটক করে।

অন্যদিকে, দেশ থেকে অবৈধভাবে বাইরে পাচারের সময় শুক্রবার ভোররাত সোয়া ৩টার দিকে বিজয়পুর বিওপির সদস্যরা সীমান্ত পিলার ১১৪৯/৬-এস হতে পাঁচশো গজ ভেতরে জংখল নামক স্থান থেকে ২৮ হাজার টাকা মূল্যের ২০০ কেজি বাংলাদেশী রসুন জব্দ করে। এছাড়া শুক্রবার ভোর ৫টায় বরুয়াকোনা বিওপির একটি বিশেষ টহল দল সীমান্ত পিলার ১১৮০/১০-এস হতে চারশো গজ ভেতরে ছোট পাতলাবন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৭২ হাজার টাকা মূল্যের ৪৮ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করে।

বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা মালামাল ফেলে পালিয়ে যাওয়ায় কোনো অভিযানেই কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি এবং সবগুলো পণ্যই মালিকবিহীন অবস্থায় জব্দ করা হয়।

৩১ বিজিবি’র অধিনায়ক জানান, জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ মালামাল সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮ বোতল ভারতীয় মদ নেত্রকোনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে এবং ৫৪০ পিস বাঁশ বিজয়পুর বনবিট অফিসে জমা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। আটককৃত দুইটি ভারতীয় গরু নেত্রকোনা কাস্টমস প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রকাশ্যে নিলাম করা হবে। এছাড়া ১৬৭ পিস কম্বল, ১৫ হাজার ৩৬০ কেজি কয়লা, তিনটি নৌকা এবং ২০০ কেজি রসুন নেত্রকোনা কাস্টমস অফিসে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সীমান্ত সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির স্বার্থে বিজিবি’র এমন তৎপরতা স্থানীয় সচেতন মহলে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে ৩১ বিজিবি’র জওয়ানদের এমন ধারাবাহিক অভিযান সীমান্তে অপরাধ দমনে শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পড়ুন : অধ্যক্ষের পদত্যাগ ও পুলিশি হামলার প্রতিবাদে আজিমপুরে সড়ক অবরোধ

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন