দিল্লিতে বসে থাকা গণহত্যাকারীরা দেশে রাজনীতি করতে পারবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশের মানুষ আর কোনোদিন গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে এ দেশে রাজনীতি করতে দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেছেন, যারা বাংলাদেশে অন্যায়, অভিশাপ, দুঃশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের রক্ত নিয়েছে, এ দেশের ওপর অত্যাচার করেছে, সেই জালেম, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী ও খুনি আওয়ামী লীগের এ দেশে আর রাজনীতি হবে না।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জুমার নামাজের আগে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসার ১০৪তম দুই দিনব্যাপী বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলনের সমাপনী দিনে অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করছেন প্রতিষ্ঠানটি মহাপরিচালক হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ মোহাম্মদ মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, যেটি ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী হয়েছে। এই নির্বাচনের আগে এবং আন্দোলনের সময় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও দ্বীনের পক্ষে, দেশের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদী, ইসলামবিদ্বেষী অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ জারি রেখেছিলেন, তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় হুজুর আমিরে হেফাজত হযরত মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী। তার পূর্বে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের মধ্যে আপনারা জানেন হযরত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, আমাদের মুরুব্বি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর লেগেছে। ফ্যাসিবাদ থেকে, এই ইসলামবিদ্বেষী ও আলেমবিদ্বেষী সরকারের হাত থেকে এ দেশের জনগণকে উদ্ধার করতে ১৬-১৭ বছর লেগেছে। রক্ত দিয়েছেন আলেম-ওলামারা। আলেম-ওলামা এবং ছাত্রসমাজের কত শহীদ হয়েছেন, সেই শহীদদের নাম এখনো আপনারা সবাই জানেন না। কবরের ঠিকানা জানি না। এত রক্তদানের মধ্য দিয়ে, রক্তের সিঁড়ি বেয়ে, রক্তাক্ত এক উদ্ধারের মধ্য দিয়ে আমরা এই ইসলামবিদ্বেষী সরকারের হাত থেকে মুক্ত হয়েছি।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শুধু জুলাই-আগস্টে এই গণ-অভ্যুত্থানের সময় জাতিসংঘের হিসাবমতে ১ হাজার ৪০০ মানুষকে শহীদ হতে হয়েছে। তার আগে বিগত ১৬-১৭ বছরে ফ্যাসিবাদীদের সময়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষকে গুমের শিকার হতে হয়েছে। আমিও তার মধ্যে একজন ছিলাম। রব্বুল আলামিন আমার হায়াত রেখেছেন। আমি বেঁচে আছি আপনাদের দোয়ায়, আল্লাহর রহমতে। প্রায় ৭ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ হামলা-মামলায় নিপীড়িত হয়েছেন। আমরা কি আবার সেই ফ্যাসিবাদীদের পুনর্গমন, পুনরাগমন চাই? প্রত্যাবর্তন চাই? তাহলে সেই ক্ষেত্র আজকে কারা তৈরি করে দিচ্ছে?

তিনি বলেন, যারা গার্মেন্টসে অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে, তাদের পেছনে সেই ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত আছে। এ দেশে দুষ্কৃতকারী আছে, যারা ইসলামের নাম বিক্রি করে রাজনীতি করছে, অথচ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইসলামের ধারে-কাছেও কিছু নেই। যারা ইসলামী দল বলে নিজেদের ঘোষণা করছে, তাদের দলীয় ম্যানিফেস্টো থেকে হাকিমুদ্দিন বাদ দেওয়া হয়েছে, আপনারা জানেন।

তারা মুখে এক কথা বলে, কিন্তু তাদের দলিলে কী প্রমাণ আছে, সেটা বলে না। তারা কখনো তাদের ইশতেহারে বলেনি, তারা ইসলামী শাসন চায়। তারা কখনো বলেনি, তারা এ দেশে শরিয়াভিত্তিক আইন-কানুন চায়, শরিয়া চালু করতে চায়। তারা বরং উল্টো বলেছে যে তারা শরিয়াভিত্তিক শাসনের বিপক্ষে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করি। আমরা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করি। আমরা বিসমিল্লাহ সংযোজন করেছি, কোরআন পাঠ করেছি। আমরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছি। আমরা এ দেশের সকল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের সৃষ্টি করেছি, যেখানে আমাদের সবারই একটি জাতীয় পরিচয় আছে।

তিনি বলেন, এ দেশে আমরা কখনো জাতির মধ্যে বিভেদ দেখতে চাই না। যারা ধর্মের নাম বিক্রি করে রাজনীতি করছে, তাদের কার্যক্রমে ধর্মীয় কোনো প্রতিফলন নেই। তারা কেবলই এ দেশে বিভক্তির সৃষ্টি করছে। তারা স্বাধীনতার পূর্ব থেকে স্বাধীনতার পর পর্যন্ত বিভ্রান্তিমূলক রাজনীতি করে এ দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। আবার তারা সেই রাস্তায় গিয়েছে।

জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার ভাই চলে গিয়েছেন, জুলাই সনদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—আরেকটা শব্দ বলেননি, জুলাই আদেশ। আমরা পরিষ্কার করে বলেছি, এ দেশের ছাত্রগণের উত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে যে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে, সেটা তো আমরা বাস্তবায়ন করবই এবং এর বাইরে আমরা ইসলামী মূল্যবোধের সকল অংশ সংবিধানে ধারণ করব, ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, আমাদের প্রতিশ্রুতি, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যে সমস্ত জাতীয় মূলনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি থেকে মহান আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টি বাদ দিয়েছিলেন, সেটা আমরা পুনঃস্থাপন করব। সংবিধানের প্রস্তাবনায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মহান আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস—সেই কথাটি পুনরায় আমরা ধারণ করব। আপনারা চান? ইনশাআল্লাহ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সংবিধানের প্রথমেই ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যিনি ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে, তিনি আমাদের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। আমরা সেই দলের পক্ষে রাজনীতি করি।

তিনি আরও বলেন, যারা বাংলাদেশে অন্যায়, অভিশাপ, দুঃশাসন, দুর্যোগের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের রক্ত নিয়েছে, এ দেশের ওপর অত্যাচার করেছে, দেশের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে, সেই জালেম, সেই স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী, খুনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের এ দেশে আর রাজনীতি হবে না।

তিনি বলেন, যারা তাদের প্রত্যাবর্তনকে সহজ করতে চায়, যারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিভ্রান্তিমূলক রাজনীতি করে ফ্যাসিবাদী আলামনকে সুগম করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলি, বাংলাদেশের মানুষ কোনো দিন গণহত্যাকারীদের এ দেশে রাজনীতি করতে দেবে না।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা গণহত্যাকারী, তারা এখনো পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি, অনুশোচনা করেনি, অনুতপ্ত নয়। যারা গণহত্যাকারী, যারা এ দেশের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, নিজের আপন ঠিকানা দিল্লিতে বসে আছে, তারা কখনো এ দেশে এসে রাজনীতি করতে পারবে না।

তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে অনেক বিতর্ক হবে, রাজনৈতিকভাবে আমাদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি থাকবে, আমাদের একেকজনের একেক রকমের আদর্শভিত্তিক রাজনীতি থাকতে পারে। কিন্তু একটা প্রশ্নে আমরা একমত, এ দেশের মানুষকে যারা হত্যা করেছে, গণহত্যা চালিয়েছে, ম্যাসাকার করেছে, দীর্ঘ ১৭ বছর যারা আলেম-ওলামার রক্ত নিয়েছে, মসজিদে বসে যারা নামাজ আদায় করতে পারেনি, মসজিদকে রক্তাক্ত করেছে, সেই সমস্ত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে এ দেশের মানুষ আর কখনো রাজনীতি করতে দেবে না।

আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যারা আন্দোলনের নামে আজকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, সমালোচনা করুন। গঠনমূলক সমালোচনা হতে হবে। সরকারকে সহযোগিতা করতে পারেন, কিন্তু দেশের মানুষের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করবেন না।

তিনি বলেন, আমরা চাই, এই দেশটাকে ঐক্যবদ্ধ রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করি, সমৃদ্ধি করি, রপ্তানি বৃদ্ধি করি, কর্মসংস্থান করি, সমস্ত জায়গায় আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করি। আমরা সকল মানুষকে নিয়ে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে হবে। সমস্ত আলেম-ওলামা, কওমি লাইনের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়ন করতে হবে।

শেষে তিনি বলেন, আপনারা সবাই সহযোগিতা করবেন। ইনশাআল্লাহ, আমাদের এই যাত্রাপথে রব্বুল আলামিন সহায় হবেন। আপনারা সবাই দোয়া করবেন। আমাদের মুরুব্বিদের কাছে আমরা সকল সময় দোয়া চাই। দেশের মানুষের সহযোগিতা এবং দোয়া চাই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রক্ত যার শরীরে প্রবাহমান, যিনি দেশের প্রেমে প্রশ্নাতীত, যিনি বাংলাদেশের কল্যাণে, এ দেশের মানুষের কল্যাণে তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছেন, আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান, তাঁর জন্য আপনারা দোয়া করবেন। ইনশাআল্লাহ, আমরা সঠিকভাবে এ দেশ এগিয়ে নিয়ে যাব।

তিনি আরও বলেন, আজকে জুমার সময়ের আগে আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলার কথা না, এখানে আমি বক্তব্য রাখার কথাও না। যেহেতু আমরা রাজনীতির মানুষ, সকল মানুষের কল্যাণে এবং দেশের কল্যাণে নসিহত করার জন্য আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি, সেজন্য আমাকে কথা বলতে হলো। হয়তো আমি রাজনীতির কথা বেশি বলেছি, আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু এই রাজনীতিও তো দেশের কল্যাণ, এই রাজনীতিও তো মানুষের কল্যাণ। এবং আমরা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী বলেই আমরা সব সময় ইসলামী প্রতিষ্ঠান, দ্বীনি প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামের হেফাজত করার জন্য সব সময় আত্মনিয়োগ করব, ইনশাআল্লাহ।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম ও বিভিন্ন আলেম ওলামা সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : মরিশাসে কর্মস্থলে ভারী কাচের বাক্স চাপায় তিন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন