“উদ্ভাবননির্ভর বাংলাদেশ গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি”- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নেত্রকোনায় উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ-২০২৬। শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিকেলে শহরের দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে তিন দিনব্যাপী বিজ্ঞান মেলার শুভ উদ্বোধন করা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন এই মেলার আয়োজন করেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান। মেলায় সভাপতিত্ব করেন, নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “আমরা এখন এআই, রোবোটিক্স এবং স্পেস টেকনোলজির যুগে প্রবেশ করেছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে না পারলে কোনো দেশ উন্নত হতে পারবে না। ড্রোন প্রযুক্তিতে তুরস্ক এবং নিজস্ব মিসাইল প্রযুক্তিতে ইরান আজ বিশ্বে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। গুগল, অ্যাপলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ। আমাদেরও সেই সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।”
শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে তিনি রাজবাড়ীর বিজ্ঞানী সুদীপ্ত মণ্ডলের উদাহরণ টানেন, তার উদ্ভাবনের জন্য নাসায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ওই তরুণকে নেত্রকোনায় এনে এখানকার শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করবেন বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
একইসাথে জেলার শিক্ষাব্যবস্থায় বড় একটি নির্দেশনার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নেত্রকোনার প্রতিটি স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে চারটি ক্লাব গঠন করতে হবে- সায়েন্স ক্লাব, ডিবেটিং ক্লাব, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব এবং কালচারাল ক্লাব।”
সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা জানান, জেলার ১০টি উপজেলা থেকে বিজয়ী শিক্ষার্থীরা জেলা পর্যায়ের মেলায় অংশ নিচ্ছে। এখান থেকে বিজয়ীরা বিভাগীয় এবং পরে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেবে। তিন দিনব্যাপী এই মেলায় প্রজেক্ট প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, কুইজ এবং উপস্থিত বক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ঘোষণা করে বলেন, “আগামী ১৯ ও ২০ এপ্রিল নেত্রকোনায় ‘ভ্রাম্যমাণ বিজ্ঞান প্রদর্শনী’ বা সায়েন্স ভ্যান আসবে। দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় ভ্যানটি নেত্রকোনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে মহাকাশসহ বিজ্ঞানের নানা উদ্ভাবন সরাসরি দেখার সুযোগ পাবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে, যার বেশিরভাগই চীন, তুরস্ক, ব্রাজিল বা আমেরিকা থেকে আমদানি করতে হয়। আমাদের এই আমদানি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এখানকার ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের একদিন এমআইটি এর মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে পড়ার স্বপ্ন দেখতে হবে, যাতে তারা দেশেই এসব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে।”
অনুষ্ঠানে নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবীর জেলা প্রশাসকের চারটি ক্লাব গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “রোবোটিক্সের এই যুগে প্রথাগত পেশাগুলো বদলে যাবে। তাই আমাদের শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে হবে।”
এছাড়া তরুণ বিজ্ঞানীদের মেধার বিকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা ও পৃষ্ঠপোষকতার কথা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন, নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী।
উদ্বোধনী আলোচনা শেষে অতিথিবৃন্দ মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। মেলায় নেত্রকোনা সরকারি কলেজ, জুবাইদা রহমান মহিলা ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সোলার পাওয়ার, স্মার্ট সিটি, স্মার্ট ট্রান্সপোর্ট ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধক সিস্টেমসহ চমকপ্রদ সব উদ্ভাবনী প্রজেক্ট প্রদর্শন করছে।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানগণ, দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। মেলার এ আয়োজন নেত্রকোনার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


