বিজ্ঞাপন

শাপলা চত্বরে হত্যাযজ্ঞ: ভয়াল এক রাতে রক্ত, চিৎকার আর বাঁচার শেষ চেষ্টা

২০১৩ সালের ৫ মে। রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে যৌথ বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেদিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও পবিত্র কুরআনের অবমাননার প্রতিবাদসহ ১৩ দফা দাবিতে আলেম-ওলামা ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শাপলা চত্বরে সমবেত হন। দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পর মধ্যরাতে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে চলে হত্যাযজ্ঞ। সমাবেশ ঘিরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডে পুরো এলাকা রূপ নেয় রক্ত, চিৎকার আর আতঙ্কের মঞ্চে। দিশেহারা মানুষ প্রাণ বাঁচাতে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ালেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি অনেকের।

বিজ্ঞাপন

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গত ৩ মে জানান, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে মোট ৫৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন এবং চট্টগ্রামে ৫ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম প্রাথমিকভাবে ৯৩ জন নিহতের তালিকা প্রকাশ করে, যা পরে আরও বাড়তে পারে বলে জানানো হয়। ২০২১ সালে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার ৬১ জন নিহতের নাম সংগ্রহের কথা জানায়। ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে নিহতের সংখ্যা ৪১ জন উল্লেখ করা হয়।

তবে কোনো পক্ষই এই সংখ্যাকে চূড়ান্ত বলে দাবি করেনি। পাশাপাশি আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি।

হেফাজতের অভিযোগ ও দাবি

সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তাদের গুন্ডা বাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী আহতদের এমন ভয়ভীতি দেখিয়ে, যাতে তারা যে শাপলা চত্বরে গেছে, সেটাও স্বীকার না করে। এমন ভীতিকর পরিস্থিতিতে ভিকটিম ট্রমা থেকে বের হতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকের বাবা শহীদ হয়েছেন, ভাই শহীদ হয়েছেন, কিন্তু তারা স্বীকার করতে ভয় পান। তারা বলে, এটা স্বীকার তারা নিজেরা আবার কোন বিপদে পড়েন।’

২০১৩ সালের মে মাসে আঞ্জুমানে মফিদুল ৫ শতাধিক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে উল্লেখ করে হেফাজতের এ নেতা বলেন, ‘তারা এক মাসে এতো লাশ দাফন করেছে, এসব লাশ কোথা থেকে এসেছে। আগে-পরে অন্য মাসগুলোতে তারা গড়ে ২০-৩০ জনের লাশ দাফন করেছে। তারা জুরাইন কবরস্থানে যে বেওয়ারিশ লাশগুলো দাফন করেছে, সেগুলো কোথা থেকে এলো? এছাড়া কাজলায় ময়লার স্তূপে মানুষের হাড়, মাথার খুলি পাওয়া গেছে, সেগুলো কার? আমরা মনে করি শাপলা হত্যাকাণ্ডের লাশ গুম করার যে চেষ্টা তারা করেছিল, সেটারই অংশ।’

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

নেত্রকোণার পূর্বধলার একটি মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা খায়রুল ইসলাম। ২০১৩ সালে নরসিংদীর বেলাবরের কাঙ্গালিয়া মাদ্রাসায় শরহে বেকায়া (এসএসসি সমমান) পড়তেন তিনি। ৫ মে হেফাজতের কর্মসূচিতে যোগ দিতে ৪ মে সন্ধ্যায় মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকার সাইনবোর্ড এলাকায় এক মাদ্রাসায় অবস্থান নেন। সকালে মহাসড়কে হাজারো মানুষের সঙ্গে মিছিলে অংশ নেন। দুপুরে রওনা করেন শাপলা চত্বরের দিকে।

খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘বিকাল ৩টায় জানতে পারি, বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষ হয়েছে। দুই তিনজনের শহীদ হওয়ারও খবর পাই। সন্ধ্যায় দুজনের মরদেহ শাপলা চত্বরে আনার খবরে খুবই মর্মাহত হই, ভয়ও পাই। আওয়ামী লীগের এক নেতা শাপলা চত্বর ছেড়ে যেতে হুমকি দেয়। হেফাজত নেতা মামুনুল হকও মঞ্চ থেকে পাল্টা হুমকি দেন।’

রাত ৯টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকসংলগ্ন কোনো উঁচু জায়গা থেকে প্রথম সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ পান খায়রুল। রাত ১১টার পর কিছুটা সময় তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ ভয়ার্ত মানুষের চিৎকারের শব্দে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে চারদিকে অন্ধকার দেখতে পান। মানুষ ছোটাছুটি করছে। গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
শাপলা চত্বর থেকে বায়তুল মোকাররমের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন খায়রুল। ব্যারিকেড দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতিহতের চেষ্টা করেন। হঠাৎ দেখেন, পাশে দুজন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে যৌথ বাহিনীর ধেয়ে আসছে। একসময় কমলাপুরের দিকে দৌড়াতে থাকেন। পেছনে তাড়া করতে থাকে ভয়ংকর শব্দ। তার ভাষায়, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াল রাত ছিল এটি।’

৫ মে রাতে শাপলা চত্বরের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দিনব্যাপী ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ মুসল্লিদের ওপর হামলা চালায় যৌথ বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সন্ধ্যায় কয়েকজন শহীদ হন। রাতভর শাপলা চত্বরে উত্তেজনা চলতে থাকে। হেফাজত নেতাদের অনেকে ভাষণ দেন। মধ্যরাতের দিকে হঠাৎই চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। শুরু হয় গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ। চারপাশে শুধু গুলির শব্দ। যৌথ বাহিনীর আক্রমণের মুখে মানুষ দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ছুটতে থাকে। অনেকে আহত হন। শহীদদের মরদেহ পড়ে থাকে রাস্তার ধারে।

অপারেশন ফ্লাশ আউট

সরকার উৎখাতের আন্দোলনের অভিযোগে ৫ মে সন্ধ্যার আগে শাপলা চত্বর ছাড়তে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। অন্যদিকে দাবি আদায়ে অনড় অবস্থান নেয় হেফাজত। পরে সরকারের নির্দেশে রাতভর ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ নামের অভিযান চালিয়ে ব্যপক হত্যাযজ্ঞ চালায় যৌথ বাহিনী।

পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযানের নাম দেওয়া হয় অপারেশন সিকিউরড শাপলা। অপারেশন ক্যাপচার শাপলা নাম দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয় সমাবেশে যোগ দেওয়া ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। সূর্যোদয়ের আগেই রাতের অন্ধকারে খালি করে ফেলা হয় শাপলা চত্বর।

বিচারপ্রক্রিয়া ও মামলা

জুলাই অভ্যুত্থানের পর হেফাজতের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়। এতে শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মোট ৫৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। মামলায় শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারাও রয়েছেন। হেফাজতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং তারা ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী।

পড়ুন: ইরানকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা হবে: ট্রাম্প

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন