ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার, ভর্তুকি কমানো এবং রাজস্ব কাঠামো পুনর্বিন্যাসসহ বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে ফের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে সরকার ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির চলমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড় সামনে রেখে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন-২০২৬ এর কয়েকটি ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংকও।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে আইনের ১৮(ক) ধারা। এই ধারায় অনিয়ম, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনার কারণে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যাংকের আগের মালিকদের পুনরায় মালিকানা দাবি করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আইএমএফের মতে, এ ধরনের বিধান খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধে বাধা সৃষ্টি করবে এবং ব্যাংক খাতে জবাবদিহি দুর্বল করবে।
এ ছাড়া আইনের আরও কয়েকটি ধারা বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থি বলেও মনে করছে সংস্থাটি। এসব বিষয়ে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকও পৃথকভাবে এ নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে। সরকার অবশ্য দুই সংস্থাকেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে।
জানা গেছে, চলমান ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বকেয়া কিস্তি ছাড় এবং নতুন ঋণ সহায়তা নিয়ে সরকার ও আইএমএফের মধ্যে আলোচনা চলছে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুনের মাঝামাঝি সময়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসতে পারে। যদিও সফরসূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
সূত্র জানায়, গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে চলমান কর্মসূচির ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তির প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার জুনের আগে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি আইএমএফের কাছে অতিরিক্ত আরও ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কাছেও বাজেট সহায়তা ও নতুন ঋণ সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে নতুন ঋণ সহায়তা এবং আগামী বাজেটে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন সম্পর্কেও তারা জানতে চেয়েছেন এবং সরকার সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে।
জানা গেছে, জুনে ঢাকা সফরে এসে আইএমএফ প্রতিনিধি দল সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি, ঋণ কর্মসূচির শর্ত বাস্তবায়ন এবং নতুন বাজেটে ভর্তুকির মাত্রা পর্যালোচনা করবে। এ সময় তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী বাজেটে আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটি পর্যালোচনা করতেই সংস্থাটি আবার ঢাকা সফরে আসতে পারে। ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণও নতুন নয়।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সম্প্রতি সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এর আগে থেকেই আইএমএফ ভর্তুকি কমানো, রাজস্ব খাত সংস্কার এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পরামর্শ দিয়ে আসছিল।
২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি সই করে। এ পর্যন্ত সেই কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি কিস্তি পেয়েছে বাংলাদেশ।
পড়ুন:আইন লঙ্ঘন করে প্রশাসক পরিবর্তন এসআইবিএলের
দেখুন:‘ইউনূস সাহেবের আমলে খারাপ কাজ বেশি হয়েছে, সর্বনাশ বেশি হয়েছে’ |
ইমি/


