ময়মনসিংহ বন বিভাগ যেন আর সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়—বরং একটি অঘোষিত ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য। যেখানে নিয়ম-কানুন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আর সেই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ১৪তম গ্রেডের এক উচ্চমান সহকারী—ইব্রাহিম খান।
অভিযোগ উঠেছে, প্রায় দুই বছর আগে বিভাগে যোগদানের পর থেকেই স্থানীয় প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ যোগসাজশ কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে বিভাগীয় অফিসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন তিনি। বর্তমানে সংস্থাপন, রাজস্ব, করাতকল ও ডিপো লাইসেন্সসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শাখা কার্যত তার ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি ফরেস্টার, ডেপুটি রেঞ্জার ও ফরেস্ট রেঞ্জারদের ফাইলও তার অনুমতি ছাড়া নড়াচড়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহাম্মদ কাজী নূরুল করিম ও সহকারী বন সংরক্ষক সাদেকুল ইসলাম খান এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যত নিশ্চুপ। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—তারা কি প্রশাসনিকভাবে ব্যর্থ, নাকি এই দুর্নীতির নেপথ্যের নীরব মদদদাতা?
ফাইল নড়াতে লাগছে ‘টেবিল খরচ’
বিভাগীয় অফিসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর ঘুষ বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, এ,সি,আর প্রসেসিং, প্রশাসনিক অনুমোদন, বদলি সংক্রান্ত কার্যক্রম কিংবা সাধারণ অফিসিয়াল ফাইল—সবকিছুতেই চলছে অঘোষিত অর্থ লেনদেন। টাকা ছাড়া কোনো ফাইল সামনে এগোয় না, বরং ঘুষ না দিলে ফাইল আটকে রেখে হয়রানি, অপমান ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, “বিভাগীয় অফিস এখন আতঙ্কের জায়গা। টাকা ছাড়া কাজ হয় না। টাকা না দিলে এ,সি,আর খারাপ করার ভয় দেখানো হয়, বদলির হুমকি দেওয়া হয়, এমনকি অপমানজনক আচরণও করা হয়।”
নিলাম ও সি,এস জালিয়াতির অভিযোগ
সরকারি নিলাম প্রক্রিয়াকেও অভিযোগ অনুযায়ী পরিণত করা হয়েছে দুর্নীতির আখড়ায়। অভিযোগ রয়েছে, নিলামের সি,এস নথিতে কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা ও তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। একাধিক লট ক্রেতা দাবি করেছেন, পূর্ববর্তী নিলামগুলোর নথি ও আর্থিক লেনদেন তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে ভয়াবহ অনিয়ম ও সরকারি রাজস্ব লুটপাটের চিত্র। এছাড়া বিডি রিলিজ, উপকারভোগীদের লভ্যাংশ বিতরণ এবং বিভিন্ন আর্থিক অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল ছাড় হয় না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
লাইসেন্স বাণিজ্যে অতিষ্ঠ সেবাগ্রহীতারা
করাতকল ও ডিপো লাইসেন্স ইস্যু এবং নবায়নকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছে শক্তিশালী বাণিজ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি নতুন লাইসেন্স ইস্যুতে নেওয়া হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা এবং নবায়নের জন্য আদায় করা হয় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে সাধারণ ব্যবসায়ী ও সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
টি,পি ও সি,ও ইস্যুতেও চলছে অর্থ আদায়
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিভাগীয় পর্যায় থেকে টি,পি ও সি,ও ইস্যুকেও বানানো হয়েছে অবৈধ অর্থ আদায়ের নতুন উৎস। অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যেক টি,পি বাবদ ৪ হাজার টাকা এবং প্রত্যেক সি,ও বাবদ ২ হাজার টাকা আদায়ের জন্য রেঞ্জ ও এসএফএনটিসি পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এমনকি “টিম্বার ফরম” নামে মাসিক রিপোর্ট জমা দিতেও টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
বদলি বাণিজ্যে তটস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে বদলি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে “ছায়া বিভাগীয় বন কর্মকর্তা” পরিচয় দিয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। বদলি কমিটির সদস্য না হয়েও বাগানমালী থেকে ফরেস্ট রেঞ্জার পর্যন্ত বিভিন্ন পদে বদলির নিয়ন্ত্রণ তার হাতে—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। কেউ কেউ দাবি করেছেন, “কোথায় পোস্টিং হবে, কে কোন রেঞ্জে থাকবে—এসব সিদ্ধান্তও নাকি এখন অফিসিয়াল কর্তৃপক্ষ নয়, নির্ধারণ করেন ওই উচ্চমান সহকারী।” অভিযোগকারীদের দাবি, এই বদলি বাণিজ্য ও ঘুষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।
প্রভাব খাটিয়ে ইটভাটা ব্যবসার অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় অফিসের প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজ এলাকায় ইটভাটা ব্যবসা গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা। স্থানীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে মামলা ও জেল খাটার জনশ্রুতি থাকলেও বিভাগীয়ভাবে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রহস্যজনক নীরবতা
এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষকের রহস্যজনক নীরবতা জনমনে তীব্র প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হবে এবং প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় ময়মনসিংহ বন বিভাগে চলমান এই অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সরকারি প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে আরও গভীর সংকটে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।
পড়ুন : টঙ্গীর জাভান হোটেলে কিশোর গ্যাংয়ের হামলা, ককটেল সদৃশ বিস্ফোরণে জনমনে আতঙ্ক


