বর্তমান সময়ে যেখানে অনেকেই পিতা-মাতার দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন, সেখানে অসুস্থ বাবার ঋণ পরিশোধ করতে ব্যতিক্রমী ও মানবিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছেন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার এক যুবক। বাবার কাছে কারো কোনো পাওনা থাকলে তা পরিশোধের আহ্বান জানিয়ে উপজেলা শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশাযোগে মাইকিং করছেন তিনি। তার এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
জানা গেছে, উলিপুর উপজেলার ধরনীবাড়ী ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের বাসিন্দা ও কাপড় ব্যবসায়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুর হোসেন (৯০) দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী রয়েছেন। প্রায় সাত মাস ধরে তিনি অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতেই চিকিৎসাধীন আছেন। বয়সের ভার ও অসুস্থতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ায় কিছু দেনা-পাওনাও থেকে যায়।
এ অবস্থায় বাবার জীবদ্দশাতেই তার সকল ঋণ পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেন ছেলে মারুফ হোসেন (৩৮)। শনিবার (১৬ মে) সকাল থেকে দিনব্যাপী উলিপুর উপজেলা শহর, বাজার ও বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশায় মাইকিং করে তিনি ঘোষণা দিতে থাকেন—“আমার বাবা আবুর হোসেনের কাছে যদি কারো কোনো পাওনা টাকা থাকে, তাহলে দয়া করে যোগাযোগ করুন। আমরা সেই পাওনা পরিশোধ করতে চাই।”
তার এমন ব্যতিক্রমী প্রচারণা স্থানীয়দের দৃষ্টি কাড়ে। অনেকেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিষয়টি শোনেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনেকে এটিকে বর্তমান সমাজে বিরল সততা ও পারিবারিক মূল্যবোধের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, “এখনকার সময়ে বাবার সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের খবর বেশি শোনা যায়। সেখানে একজন ছেলে নিজ উদ্যোগে বাবার ঋণ শোধ করতে মাইকিং করছে—এটা সত্যিই ব্যতিক্রমী ও প্রশংসার দাবিদার।
আরেক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “মানুষ এখন নিজের দায় এড়াতে ব্যস্ত। কিন্তু এই যুবক বাবার সম্মান রক্ষার জন্য যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, তা সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।”
এ বিষয়ে মারুফ হোসেন বলেন, “আমার বাবা সারা জীবন সততার সঙ্গে ব্যবসা করেছেন। এখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। আমি চাই না তিনি কারো হক বা ঋণ রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিন। সন্তান হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব বলে মনে করি। যদি কারো কাছে বাবার কোনো দেনা থাকে, আমি তা পরিশোধ করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সমাজে অনেক সময় মানুষ লজ্জা বা সংকোচে পাওনার কথা বলতে পারেন না। তাই আমি নিজেই মানুষের কাছে আহ্বান জানাতে মাইকিং করেছি, যেন কেউ বঞ্চিত না হন।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, আত্মকেন্দ্রিকতার এই সময়ে মারুফ হোসেনের উদ্যোগ শুধু একজন বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধই নয়, বরং সমাজে নৈতিকতা, সততা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

