প্রতিদিন সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজে চোখ বুলানো কিংবা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে নিউজফিডের পাতা স্ক্রল করা আধুনিক নাগরিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এক নতুন সকাল, আর তার সাথে হাজির হয় সম্পূর্ণ নতুন এক ঝাঁক খবরের শিরোনাম। কখনো বড় কোনো রাজনৈতিক ওলটপালট, কখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনের উত্তেজনা, কখনো বা কোনো রাঘববোয়ালের কোটি কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি, আবার কখনো আকস্মিক কোনো সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের হৃদয়বিদারক দৃশ্য। খবরের এই গতিশীল স্রোত প্রতিনিয়ত বহমান; একটার পর একটা খবর আসে, পুরোগুলো ঢাকা পড়ে যায় নতুনের নিচে। খবরের এই রূপান্তর অত্যন্ত দ্রুত এবং চমকপ্রদ। কিন্তু যদি আমরা চটজলদি খবরের উপরিভাগ থেকে চোখ সরিয়ে একটু গভীরে তাকাই, তবে একটি অত্যন্ত নির্মম, নিষ্ঠুর এবং হতাশাজনক সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়—খবরের শিরোনাম, তারিখ এবং পাত্রগুলো প্রতিনিয়ত ভুলে গেলেও, যে মৌলিক সংকট বা কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সেই খবরগুলোর জন্ম হচ্ছে, তার চরিত্র বা অভ্যন্তরীণ রূপটি বছরের পর বছর, এমনকি দশকের পর দশক ধরে একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর থেকে গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ এক অদ্ভুত ও চক্রাকার বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি, কিন্তু ঘটনাগুলোর পেছনের মূল কারণ ও চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা আসলে একই বৃত্তের মধ্যে বারবার আবর্তিত হচ্ছি। কেন খবর বদলালেও আমাদের চারপাশের মৌলিক সমস্যাগুলোর চরিত্র বদলায় না? কেন যুগের পর যুগ পার হয়ে গেলেও আমরা একই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাধির মুখোমুখি হচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর জন্য আমাদের সমাজের গভীর মনস্তত্ত্ব, রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং সামগ্রিক বিচারহীনতার সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করতে হবে।
১. সড়ক দুর্ঘটনা: চিরচেনা মৃত্যুর মিছিল এবং একই অজুহাত
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের পাতা উল্টালেই বা টেলিভিশনের স্ক্রিনে তাকালেই প্রতিদিন যে খবরটি অত্যন্ত নিয়মিত এবং অবধারিতভাবে আমাদের চোখে পড়ে, তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। আজ হয়তো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হয়েছেন, কাল হয়তো ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তার পরদিন হয়তো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিন সদস্যের অকাল মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন খবরের স্থান, কাল, নিহতদের নাম এবং বাসের নাম বদলে যাচ্ছে। আজ অমুক পরিবহন তো কাল তমুক পরিবহন।
কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে দেখা যাবে, এই দুর্ঘটনার পেছনের মূল কারণগুলো কি গত ৩০ বছরে এক চুলও বদলেছে? উত্তর হলো—না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে আমরা যুগের পর যুগ ধরে যে বিষয়গুলো শুনে আসছি, সেগুলো হলো:
১. লাইসেন্সবিহীন, ভুয়া লাইসেন্সধারী কিংবা চরম অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক।
২. ফিটনেসবিহীন, ব্রেকহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন রাস্তায় অবাধে চলাচল করা।
৩. চালকদের মধ্যে ওভারটেকিংয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং মহাসড়কে বেপারোয়া গতি।
৪. সড়ক ও মহাসড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, বিপজ্জনক বাঁক এবং ফুটপাত দখল।
৫. হাইওয়ে পুলিশ এবং বিআরটিএ-র একাংশের চরম তদারকির অভাব, অবহেলা ও পদ্ধতিগত দুর্নীতি।
যখনই কোনো বড় বা গণমাধ্যমের আলো কাড়া দুর্ঘটনা ঘটে, তখন দেশজুড়ে কয়েকদিন খুব শোরগোল হয়। উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, কমিটি কিছু গৎবাঁধা সুপারিশ জমা দেয়, মন্ত্রী-আমলারা গণমাধ্যমের সামনে এসে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুংকার দেন। কিন্তু কিছুদিন পার হতেই যখন জনমানুষের স্মৃতি থেকে সেই ঘটনাটি আবছা হয়ে যায়, তখন সবকিছু আবার আগের মতোই চলতে থাকে—ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না আরেকটি বড় ও বিভীষিকাময় দুর্ঘটনা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। খবর প্রতিদিন বদলাচ্ছে, কিন্তু সড়কের নৈরাজ্য, লাশের স্তূপ আর রক্তপাতের চরিত্রটি একটুও বদলায়নি
২. বর্ষার ঢাকা ও জলজট: একবিংশ শতাব্দীতেও মধ্যযুগীয় দুর্ভোগ
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই বাংলাদেশের, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার গণমাধ্যমগুলোর প্রধান ও অবধারিত খবর হয়—”সামান্য বৃষ্টিতেই পানির নিচে ঢাকা”, “রাজধানীতে তীব্র জলজট, নগরবাসীর চরম দুর্ভোগ”, “নৌকায় চড়ে অফিস যাতায়াত”। মিরপুর, শান্তিনগর, পুরান ঢাকা, খিলগাঁও কিংবা ধানমন্ডির রাস্তাগুলো যখন সামান্য এক-দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে নদীতে পরিণত হয়, তখন সংবাদকর্মীরা চমৎকার সব ছবি আর ভিডিও তৈরি করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল আর মিমের বন্যা বয়ে যায়।
আশির বা নব্বইয়ের দশকেও বর্ষাকালে ঢাকার খবরের চরিত্র যা ছিল, আজ ২০২৬ সালেও এসে তা হুবহু এক। কেন এই জলজট বা জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে দেশের প্রধান মেগাসিটি মুক্তি পায় না? এর পেছনের কারণগুলোও ঢাকার প্রতিটি নাগরিকের মুখস্থ:
ঢাকার চারপাশের ঐতিহ্যবাহী খাল, জলাশয় ও নিছু জমিগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীরা দখল করে আবাসন বা বহুতল ভবন তৈরি করেছে।
শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত অপরিকল্পিত, অপ্রতুল এবং ময়লা-আবর্জনায় ঠাসা।
পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলার কারণে ভূগর্ভস্থ নালা-নর্দমাগুলো পুরোপুরি ভরাট হয়ে আছে।
বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার (যেমন ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, তিতাস, ডেসকো) মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। এক সংস্থা রাস্তা পিচ ঢালাই করে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে অন্য সংস্থা পাইপ লাইনের জন্য সেই রাস্তা খনন করে।
প্রতি বছর মেগা প্রজেক্টের ঘোষণা দেওয়া হয়, শত শত কোটি টাকা খরচ করে ড্রেন পরিষ্কার ও সংস্কারের বার্ষিক উৎসব চলে। কিন্তু বর্ষার প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই প্রমাণিত হয় যে, কাজের কাজ আসলে কিছুই হয়নি। খবরের তারিখ পাল্টায়, বর্ষার মেঘ পাল্টায়, কিন্তু পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ঢাকার সেই চেনা নরকগুলজার রূপ আর নগরবাসীর ক্ষোভের চরিত্র একই থেকে যায়।
৩. বাজার সিন্ডিকেট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: সাধারণ মানুষের চিরস্থায়ী হাহাকার
”রমজান এলেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি”, “পেঁয়াজের বাজারে আগুন, আমদানির সিদ্ধান্ত”, “সিন্ডিকেটের কবলে চালের বাজার, দিশেহারা ভোক্তা”—এই শিরোনামগুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়, বরং এক ধরণের রুটিন খবরের মতো হয়ে গেছে। বাজারে সংকটে থাকা পণ্যের নাম মাঝেমধ্যে বদলায়; কখনো পেঁয়াজ, কখনো কাঁচা মরিচ, কখনো ডিম, কখনো চিনি, আবার কখনো ভোজ্যতেল। কিন্তু এই সংকটের অভ্যন্তরীণ চরিত্রটি সম্পূর্ণ অভিন্ন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে বাজারে গিয়ে লোকদেখানো অভিযান চালায়, কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করে, যা বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে নস্যি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বৈঠক করে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ বাজারে ব্যবসায়ীরা সেই সরকারি দামের তোয়াক্কাই করেন না। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, কোল্ড স্টোরেজে পণ্য আটকে রেখে কিংবা আমদানির ভুয়া অজুহাত দেখিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোক্তার পকেট থেকে।
এই সমস্যার চরিত্র না বদলানোর মূল কারণ হলো “সিন্ডিকেট” নামক এক অদৃশ্য অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী মাফিয়াতন্ত্র। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রায়শই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অথবা নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ফলে যখনই কোনো পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়, সরকার ও প্রশাসন থেকে বলা হয় “কোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না”। কিন্তু বাস্তবে সেই কঠোরতার কোনো বাস্তব প্রতিফলন সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না। ফলে খবরের পাতায় পণ্যের নাম আর দামের অঙ্কটা কেবল ওঠানামা করে, কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের বাজারের থলে ছোট হয়ে যাওয়ার এবং পুষ্টিহীনতায় ভোগার দীর্ঘশ্বাসটি একই থেকে যায়।
৪. ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণ: অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খবরের দিকে তাকালে বিগত দেড়-দুই দশক ধরে একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ও হতাশা তৈরি করে—তা হলো ব্যাংকিং খাতে চরম নৈরাজ্য, কেলেঙ্কারি এবং খেলাপি ঋণের পাহাড়। কোনো বছর বেসিক ব্যাংক, কোনো বছর ফারমার্স ব্যাংক, কোনো বছর ওরিয়েন্টাল ব্যাংক, আবার কোনো বছর নির্দিষ্ট কিছু বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের হাজার হাজার কোটি টাকা বেনামে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের খবর গণমাধ্যমে আসে।
প্রতিবারই খবরের শিরোনামে নতুন কোনো ব্যাংকের নাম বা নতুন কোনো পরিচালকের নাম যুক্ত হয়। কিন্তু যদি আমরা অপরাধের প্রক্রিয়াটি লক্ষ্য করি, তবে দেখব তা একদম এক ও অভিন্ন: রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন। বন্ধকী সম্পত্তির অতিরিক্ত ও অবাস্তব মূল্যায়ন দেখিয়ে ব্যাংকের টাকা তুলে নেওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল নজরদারি এবং কখনো কখনো প্রভাবশালী মহলের চাপে নীরবতা পালন।
ঋণ নেওয়ার পর তা আর ফেরত না দিয়ে বছরের পর বছর পুনঃতফসিলীকরণ করা বা আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রিট করে রাখা।
বছরের পর বছর ধরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কেবল জ্যামিতিক হারে বাড়ছেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বা বিশ্বব্যাংক যখন ঋণের শর্ত হিসেবে চাপ দেয়, তখন কিছু কাগুজে সংস্কারের কথা বলা হয়। কিন্তু ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব এই সমস্যার চরিত্রকে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এক চিরস্থায়ী ক্ষতে পরিণত করেছে। ব্যাংকের নাম বদলায়, এমডির চেয়ার বদলায়, কিন্তু জনগণের আমানত লুটে নেওয়ার মহোৎসবের চরিত্র একটুও বদলায় না।
৫. শিক্ষা খাতের নৈরাজ্য: প্রশ্নফাঁস, উপাচার্যদের দুর্নীতি ও ছাত্র রাজনীতির হিংস্রতা
আমাদের শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, খবরের শিরোনামগুলো কীভাবে এক নির্দিষ্ট চক্রাকারে আবর্তিত হয়। একসময় খবরের প্রধান বিষয় ছিল “এসএসসি বা এইচএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস”। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে ফাঁসের পদ্ধতি বদলেছে—আগে হতো ছাপা কাগজে পরীক্ষার হলের বাইরে, পরে তা ডিজিটাল রূপ নিয়ে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম গ্রুপে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সরকার কখনো পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়, কখনো ইন্টারনেট বন্ধ রাখে, কিন্তু সমস্যার মূলে হাত দিতে পারে না।
আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খবরের দিকে তাকালে দেখা যায় উপাচার্য ও শিক্ষকদের বড় অংশের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং টেন্ডারবাজি। এর সাথে যুক্ত হয় ছাত্র রাজনীতির নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। কখনো বুয়েটের আবরারের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, কখনো অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট বাণিজ্য আর গেস্টরুম কালচারের নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হয়। ঘটনা ঘটার পর ক্যাম্পাস উত্তাল হয়, শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে, প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে, দু-চারজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। কিছুদিন পর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে আবার সেই একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। খবরের শিরোনামে শুধু ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর মুখ আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামটা পরিবর্তিত হয়, কিন্তু ভেতরের পচনশীল ও অমানবিক চরিত্রটি একই থেকে যায়।
৬. স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা: ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ও হাসপাতালের শয্যা সংকট
প্রতি বছর গ্রীষ্ম আর বর্ষা এলেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি চেনা খবর ডালপালা মেলে বসে—তাহলো “ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবণতি, হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, স্যালাইনের কৃত্রিম সংকট”। বিগত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু আর কোনো মৌসুমী রোগ নয়, বরং এটি সারা বছরের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, প্লেটলেট আর স্যালাইনের জন্য রোগীর স্বজনরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
এই খবরের পেছনের সমস্যাটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখব এর চরিত্রও অপরিবর্তিত। মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশনের নিম্নমানের ওষুধ কেনা, ফগার মেশিন নিয়ে লোকদেখানো মহড়া, আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আগাম প্রস্ততির অভাবই এর জন্য দায়ী। যখন ডেঙ্গু মহামারী রূপ নেয়, তখন শুরু হয় এক সংস্থার ওপর অন্য সংস্থার দায় চাপানোর খেলা। সিটি কর্পোরেশন বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিকিৎসা দিতে পারছে না, আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলে সিটি কর্পোরেশন মশা মারতে পারছে না। এই কাদা ছোঁড়াছুড়ির খবর আমরা প্রতি বছর পড়ি, কিন্তু মশা মারার বা স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর স্থায়ী কোনো সমাধান দেখতে পাই না।
৭. এই স্থবিরতার কারণ: সমস্যার চরিত্র কেন বদলায় না?
কেন আমাদের দেশের এই মৌলিক সমস্যাগুলো সময়ের সাথে সাথে আধুনিক বা উন্নত প্রযুক্তির যুগে এসেও সমাধান না হয়ে চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করছে? এর পেছনে কয়েকটি গভীর, মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে যা সমাজকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে:
ক) জবাবদিহিতা ও সুশাসনের চরম অভাব
যেকোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সমস্যা স্থায়ী রূপ নেওয়ার প্রধান কারণ হলো অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া। সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হলে যদি পরিবহন মালিক বা চালকের কঠোর সাজা হতো, তবে অন্যেরা গাড়ি চালানোর সময় দশবার ভাবত। বাজার সিন্ডিকেটের হোতাদের যদি জেলে পোরা হতো, তবে কৃত্রিম সংকট তৈরির সাহস কেউ পেত না। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায় রাজনৈতিক আশ্রয়, পেশীশক্তি বা বিপুল অর্থের জোরে। সুশাসনের এই অনুপস্থিতি অপরাধের চরিত্রকে টিকিয়ে রাখে এবং আরও শক্তিশালী করে।
খ) দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব এবং জোড়াতালি (Ad-hoc) সমাধান
আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র ও নীতিনির্ধারকরা যেকোনো সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী, বিজ্ঞানসম্মত ও স্থায়ী পরিকল্পনার চেয়ে তাৎক্ষণিক বা সাময়িক জোড়াতালি দেওয়া সমাধান (Ad-hoc solution) পছন্দ করেন। ডেঙ্গু বাড়ছে? ড্রেনে দুই বালতি কেরোসিন ঢেলে দাও। বন্যা হচ্ছে? কিছু চাল আর শুকনো খাবার বিতরণ করে ছবি তোলো। কিন্তু ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংসের স্থায়ী বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদী ড্রেজিং ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের টেকসই উদ্যোগের অভাব সবসময়ই স্পষ্ট। আমরা সংকটের ডালপালা ছাঁটতে পছন্দ করি, কিন্তু শিকড় উপড়ে ফেলার সাহস বা সদিচ্ছা দেখাই না।
গ) প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দলীয়করণ ও পদ্ধতিগত দুর্নীতি
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিআরটিএ (BRTA), রাজউক (RAJUK), সিটি কর্পোরেশন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালীভাবে কাজ করতে পারত, তবে দেশের অর্ধেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক দলীয়করণ এবং দুর্নীতির গভীর জালে বন্দি। যে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব অনিয়ম দূর করা, সে নিজেই যখন অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়, তখন সমস্যার চরিত্র বদলানোর আশা করা অবান্তর।
ঘ) নাগরিক অসচেতনতা, উদাসীনতা ও অভ্যস্ততার সংস্কৃতি
আমরা, অর্থাৎ দেশের সাধারণ নাগরিকরাও এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার সাথে কোথাও না কোথাও আপস করে নিয়েছি। এটি আমাদের মনস্তত্ত্বের এক বড় দুর্বলতা। আমরা এখন মনে করি—রাস্তায় জটলা ও জ্যাম হবেই, একটু বৃষ্টি হলে পানি জমবেই, বাজারে গেলে সিন্ডিকেটের কারণে দাম বেশি দিতেই হবে, সরকারি অফিসে গেলে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়বে না। এই যে “সবকিছু মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি” বা অনাচারের প্রতি আমাদের এক ধরণের যৌথ অভ্যস্ততা ও সহনশীলতা তৈরি হয়েছে, তা অন্যায়ের স্থায়িত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আমরা সাময়িকভাবে ফেসবুক বা চায়ের দোকানে তীব্র খুব প্রকাশ করি, কিন্তু নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী, নিয়মতান্ত্রিক ও সংগঠিত চাপ সৃষ্টি করতে পারি না।
অন্তহীন বৃত্ত ভাঙার আহ্বান
”খবর বদলায় কারণ সময় কখনো থমকে থাকে না, ঘড়ির কাঁটা অবিরাম ঘোরে। কিন্তু সমস্যা বদলায় না কারণ আমরা সমস্যার মূল কারণটিকে আড়াল করে কেবল সাময়িক হুজুগে মেতে থাকি।”
প্রতিদিন সকালের সংবাদপত্র বা নিউজ পোর্টাল আমাদের সমাজের এক একটি গভীর ক্ষতচিহ্নকে অবলীলায় উন্মোচিত করে। কিন্তু এই ক্ষতগুলো যদি ক্রনিক বা চিরস্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হয়, তবে একসময় পুরো রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামো ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে বাধ্য। আমরা আর কতকাল একই খবরের ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ, ভিন্ন ভিন্ন নাম আর তারিখ দিয়ে পড়ে যাব?
এই অন্তহীন এবং হতাশাজনক বৃত্ত ভাঙতে হলে আমাদের খবরের উপরিভাগ বা চমকপ্রদ শিরোনামের মোহে আটকে থাকলে চলবে না। আমাদের নজর দিতে হবে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের দিকে। আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে তাদের স্বাতন্ত্র্য ফিরিয়ে আনা, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা ও জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই সমস্যার চরিত্র বদলানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যেদিন খবরের শিরোনামের পরিবর্তনের সাথে সাথে ভেতরের মূল সংকটগুলোরও স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হবে, সেদিনই একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের প্রকৃত মেধা ও অগ্রগতির প্রকাশ ঘটবে।
অন্যথায়, বছরের পর বছর শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলাবে, খবরের তারিখ আর সন বদলাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও শোষণের চিরচেনা দুঃখজনক চিত্রনাট্যটি অবিকল একই থেকে যাবে।
পড়ুন : ফুটপাতে মৃত্যু পরোয়ানা: দখলদারিত্বকে আইনি বৈধতা দেওয়ার মহোৎসব


