নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় মানুষের অর্থ আত্মসাৎ, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি এবং শহীদ পরিবার ও বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে প্রভাবশালী এক নেতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ ও এলাকাবাসী।
মঙ্গলবার (২ জুন) বিকেল ৪টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের কাপাসটিয়া বাজারে এ কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা বাজারে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
কর্মসূচিতে উপজেলার বারইকান্দি গ্রামের বাসিন্দা এবং বিরিশিরি ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মো. খায়রুল ইসলামের বিরুদ্ধে এলাকায় দলীয় পদের অপব্যবহার, সাধারণ মানুষের জমি ও অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রতিবাদ করলে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযুক্ত খায়রুলের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অব্যবস্থাপনার কারণে পুরো উপজেলার সামগ্রিক পরিবেশ ও সামাজিক শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা তাদের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায় ও অত্যাচারের বিবরণ তুরে ধরেন।
উত্তর গুঞ্জিরকোণা গ্রামের বাসিন্দা কলি আক্তার (হিজড়া) ক্ষোভের সাথে জানান, তার বাবা ও ভাইয়ের কষ্টার্জিত জমি খায়রুল ইসলাম জোরপূর্বক আটকে রেখেছেন। জমির বন্ধকের টাকা বা জমি- কোনোটিই ফেরত দিচ্ছেন না। টাকা চাইলে উল্টো ঘরে ডেকে নিয়ে অমানুষিক টর্চার ও মারামারি করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, খায়রুল ইসলাম ঢাকায় গিয়ে বড় বড় নেতাদের সাথে ছবি তুলে এনে সেই ছবি মোবাইলে সাধারণ মানুষকে দেখিয়ে ভয় দেখান। নিজেকে শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বিএনপির নেতা দাবি করে খাইরুল ইসলাম এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। কলি আক্তার প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
উত্তর গুঞ্জিরকোণা গ্রামের শামসুন্নাহার জানান, দীর্ঘ ১৫ বছর আগে তিনি খায়রুলের কাছে ৪ কাঠা জমি বন্ধক রেখেছিলেন। এখন জমি বা জমির দলিল ফেরত চাইলে খায়রুল মারপিট করতে আসে। পাওনা টাকা ও জমির দাবি করায় খায়রুল তার পুত্রবধূ রাশিদা খাতুনকে মারধর করেছে।
পুত্রবধূ রাশিদা খাতুন জানান, ১৫ বছর আগে খায়রুলের কাছ থেকে তারা জমি কিনেছিলেন। আজ পর্যন্ত সেই জমি লিখে বা দলিল (কাউলা) করে দেওয়া হয়নি। এনিয়ে পাওনা অধিকারের কথা বলায় খায়রুল তাদের বাড়িতে এসে তাকে দুই বার মারধর করেছে এবং তার পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেছে। তিনি এই অত্যাচারের বিচার চান।
একই গ্রামের ফজলুল হক জানান, তিনি খায়রুল ইসলামের বাড়িতে, ফিশারিতে ও গরুর খামারে টানা এক বছর দিনরাত গৃহস্থালি কাজ করেছেন। বিগত তিন বছর ধরে তার হাড়ভাঙা খাটুনির ২৬ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। পাওনা টাকা চাইতে গেলে খায়রুল তাকে টাকা তো দেয়ই না, উল্টো মারধর করে এবং গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
চামারজানি গ্রামের রহম আলী মন্ডল জানান, তিনি দোকানে বসে সাধারণ মনে চা খাচ্ছিলেন। কোনো কারণ ছাড়াই খায়রুল ইসলাম লাঠিসোঁটা নিয়ে আচমকা তার ওপর চড়াও হন এবং পিটিয়ে তার হাত ভেঙে দেন। খায়রুলের কাছে তার ৫ কাঠা জমি বন্ধক রয়েছে এবং এ বিষয়ে কথা বলাতেই তার ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়। খায়রুল শহীদ পরিবারের দাপট দেখিয়ে এলাকায় মানুষ পিটিয়ে বেড়ায় বলে তিনি জানান।
একই গ্রামের বৃদ্ধ কুদ্দুস আলী মানববন্ধনে কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তিনি ৭ কাঠা জমি বন্ধক রেখেছিলেন। দুই বছর পার হলেও খায়রুল তার টাকা বা জমি কিছুই ফেরত দিচ্ছেন না, উল্টো তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ও হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। তার এখনো ৫০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। টাকা চাইলে খায়রুলের ভাই ও সে মিলে তাকে এলাকা ছাড়া করার ভয় দেখায়।
উত্তর গুঞ্জিরকোণা গ্রামের মাসুদ জানান, দোকানে চা খেতে যাওয়ার পর খায়রুল তাকে ডেকে বাঁশ দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করেন এবং মারধর করে ব্রিজের নিচে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেন। খায়রুল দম্ভোক্তি করে বলেন, এসপি সাহেবও তাকে চেনে এবং তাকে ছাড় দেয়, তাই কেউ তার কিছু করতে পারবে না। মাসুদের ১৬ কাঠা জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে রাত ১০টায় চায়ের কথা বলে ঘরের ভেতর ডেকে নিয়ে আটকে রেখেও নির্মমভাবে টর্চার করা হয়েছিল।
ব্যবসায়ী আবু নাঈম জানান, তিনি খায়রুল ইসলামের কাছ থেকে ১৭ কাঠা জমি কিনেছিলেন। সেই জমি আজ পর্যন্ত রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন না। শহীদ পরিবার ও ইউনিয়ন বিএনপির নেতার পদবীর প্রভাব দেখিয়ে তিনি সবাইকে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান। এ বিষয়ে থানায় ইতিমধ্যে দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এলাকার প্রায় ২০-২৫ জন মানুষ খায়রুলের কাছে টাকা-পয়সা পান, প্রাণের ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।
আরেক ভুক্তভোগী আব্দুল মান্নান জানান, তিনি খায়রুলের কাছে ৪ কাঠা জমি বন্ধক রেখেছিলেন। খায়রুল কিছু টাকা দিলেও এখনো তার কাছে ৩৫ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। এখন খায়রুল সেই পাওনা টাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করছেন এবং টাকা চাইলে উল্টো হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।
মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খায়রুল ইসলামের মতো সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দলীয় পদের অপব্যবহার এবং সাধারণ অসহায় মানুষের ওপর এমন জুলুম-অত্যাচারের কারণে পুরো দুর্গাপুর উপজেলার আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হচ্ছে।
অভিযোগ প্রাপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করে দুর্গাপুর থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, খাইরুল নামে জনৈক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক লোকজন অভিযোগ দায়ের করছেন। কিছু কিছু অভিযোগ লেনদেন ও জমি সংক্রান্ত বিধায় উভয় পক্ষকে থানায় এসে তাদের বক্তব্য বলার জন্য দুজন অফিসাকে পাঠিয়েছি। আজকে (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় দুপক্ষ থানায় আসবে বলে জানিয়েছে।”
ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ ও এলাকাবাসী অবিলম্বে অত্যাচারী ও অর্থ আত্মসাৎকারী নেতার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অসহায় মানুষের আত্মসাৎকৃত অর্থ ও জমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন।
পড়ুন : জমি হাতিয়ে নিতে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দেওয়ার অভিযাগ


