ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বে অবহেলা এবং অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে এক মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক বকুল মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার (৩ জুন) দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে আটক করা হয়।
হাসপাতাল ও রোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, আজ বুধবার সকালে শৈলকুপার বারইপাড়া গ্রামের মৃত রওশন শেখের ছেলে আবু জাফর কুসুম (৬৫) নামে এক ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ হয়ে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে দ্রুত রেফার্ড করেন। রোগীর স্বজনরা হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি চাইলে চালক বকুল মিয়া গাড়িতে জ্বালানি তেল না থাকার অজুহাতে যেতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে রোগীর নিরুপায় স্বজনরা নিজেদের টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় তেলের ব্যবস্থা করলেও চালক বকুল সাফ জানিয়ে দেন— তিনি কোনোভাবেই ভাড়ায় যাবেন না। সরকারি গাড়ি সচল থাকা সত্ত্বেও চালকের একগুঁয়েমি এবং হাসপাতাল চত্বরে দীর্ঘক্ষণ কালক্ষেপণের কারণে কোনো চিকিৎসা না পেয়ে একপর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অসুস্থ আবু জাফর কুসুম। এ ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় চরম উত্তেজনা তৈরি হলে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে শৈলকুপা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর তাকে পুলিশের নিকট সোপর্দ করা হয়।
রোগীর স্বজন উল্লাস হোসাইন বলেন, আমরা তেলের টাকা দিতে চেয়েছি, চালকের অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই গাড়ি নিয়ে যেতে রাজি হননি। এরপর বিকল্প ব্যবস্থা করতে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ হওয়ার কারণে উন্নত চিকিৎসা পেতে দেরি হয়। যেকারণে হাসপাতালেই ছটফট করতে করতে আমার কাকা মারা গেছেন।
এ বিষয়ে শৈলকুপা থানার ওসি (তদন্ত) শাকিল আহমেদ জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও বাদী হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। চালক বকুল মিয়াকে থানায় আটক করে নিয়ে আসা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে চালক বকুল হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক চাঞ্চল্যকর ও নীতিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের বাইরে নিতে হলে জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসকের অনুমতি এবং অফিশিয়াল রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। তবে প্রভাবশালী এই চালক নিজে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তাঁর নিজস্ব নিয়োজিত এক বহিরাগত যুবককে দিয়ে গোপনে কুষ্টিয়া রুটে অ্যাম্বুলেন্সটি ভাড়ায় ব্যবহার করেন তিনি। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল-খয়েরি শার্ট পরা এক যুবকের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই যুবক চালক বকুলের আত্মীয় এবং হাসপাতালের কেউ নন। হাসপাতালের কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই দাপটের সাথে সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত ব্যবসায় রূপান্তর করেছিলেন ওই চালক। স্থানীয়দের অভিযোগ, চালক বকুল মিয়া সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে রোগীদের কাছ থেকে দুই থেকে তিনগুণ বেশি ভাড়া হাতিয়ে নিতেন। এসব অভিযোগে বুধবার (৩ জুন) সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন চালক বকুল মিয়াকে কৈফিয়ত তলব নোটিশ দেন।
শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন বলেন, রোগী মৃত্যুর বিষয়টি দায়িত্ব অবহেলার মধ্যে পড়ে। এছাড়া তিনি যে নিজে অ্যাম্বুলেন্স চালান না এটাও প্রমাণিত। এ ব্যাপারে তাকে একাধিকবার সতর্ক করা হলে তিনি আমাদের নির্দেশ তোয়াক্কা করেনি। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
পড়ুন : কালিয়াকৈরে ছিনতাই হওয়া প্রাইভেটকার উদ্ধার, তিন ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার


