বিজ্ঞাপন

রূপগঞ্জে ৩০ গ্রামে শতাধিক মাদক স্পট

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ৩০ গ্রামের শতাধিক স্পটে চলছে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। শুধুমাত্র পূর্বাচলের ৫০ টির অধিক নির্জন প্লটের ঝোপঝাড়ে রয়েছো বাংলা মদের উন্মুক্ত চুল্লি। যেখানে প্রকাশ্যে তৈরী হচ্ছে মণের মণ বাংলামদ। যা রূপগঞ্জের আনাচে কানাচে ছাড়াও রাজধানীসহ আশপাশের জেলার পৌঁছে যাচ্ছে অবাধে। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতায় মাদক কারখানায় তৈরীর সরঞ্জাম, উপকরণ পেলেও আইনি ব্যবস্থা নিতে বিপাকে থাকেন তারা। মাঝে মধ্যে সামাজিক আন্দোলনে ও এলাকাবাসির অভিযানে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ মাদক। কিন্তু ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থাকে মাদকের গডফাদাররা।

বিজ্ঞাপন

সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচলের ৫০ টি স্পটে চোলাই তথা বাংলামদের কারখানা এবং উপজেলার ৩০টি গ্রামে রয়েছে প্রায় শতাধিক বাংলামদসহ ইয়াবা,ফেন্সিডিলের আস্তানা। যেখানে রীতিমতো বসে  ‘বাংলা মদের হাট। যেখানে প্রতি মাসে প্রায় ৫ লাখ লিটারের অধিক বাংলামদ তৈরী হয়। শুধু তাই নয়, এসব মাদকে জড়িত প্রায় ২০ হাজারের অধিক নানা বয়সী লোকজন। যাদের বেশিরভাগ কিশোর ও তরুণ। শুধুমাত্র পূর্বাচলের নির্জন প্লটের ঝোপঝাড়ে হাটলেই চোখে পড়ে শতাধিক চোলাই মদ তৈরীর অস্থায়ী কারখানা। যার রূপগঞ্জের দাউদপুর, কালীগঞ্জের বড়কাউ, পারাবর্তা, নাগরি, উলুখোলা, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীর ঘেষা এলাকায় অবস্থান৷

পূর্বাচলের ১৮ নং সেক্টর এলাকায় বাসিন্দা এরফান ভুঁইয়া বলেন, এখানকার প্রায় ৮০ ভাগ লোকই মাদকরে সাথে জড়িত। এক সময়ে গুচ্চগ্রাম হিসেবে পরিচিত গজারি বন জঙ্গলের আড়ালে লাকড়ী দিয়ে চোলাই মদ তৈরি করতো। এখন লোক চোখের আড়ালে ঝোঁপঝাড়ে একটি চক্র অস্থায়ী চুলায় মদ জ্বাল দেয়ার কাজ করে। আমরা সামাজিকভাবে আন্দোলন করেছি। কিন্তু মাদকের উপকরন গুড়সহ ভেজানো ড্রাম,চুলা,সিলিন্ডার গ্যাসের বোতল এমনকি পোটলা ভর্তি ২/৩ মণ মাদক পেলেও পুলিশের মামলা নেয়ার ঘটনা সীমিত। তারা সরাসরি হাতেনাতে ধরতে চায়। অথচ পুলিশের উপস্থিতি টেরপেলে মাদককারবারিরা তাদের উপকরণ ফেলে পালিয়ে যায়।

একই এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া বলেন, এখানে যারা মাদকে জড়িত তারা দিনে কৃষিকাজ করেন। রাতে মদ জ্বাল দেয়। এতে সহযোগীতা করে নারী সদস্যরা। ফলে সহজে চেনার বুঝায় উপায় থাকে না, কে কৃষক আর কে মাদককারবারি।

একই এলাকার মাদক ব্যবসায়ী মাসুদের স্ত্রী বলেন, এখানে যারা (স্থানীয় বাসিন্দা ও নেতা) মাঝে মধ্যে অভিযান দেয় তারা তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে শুধু প্রতিপক্ষদের ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। তাতে ব্যর্থ হলে সব পুরিয়ে দেয়।

অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মাঝেমধ্যে মাদককারবারিদের আস্তানা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তবে সংশ্লিষ্ট অপরাধী ও তাদের অবৈধ মাদক থানায় সোপর্দ করতে গেলে পুলিশের থাকে নানা অযুহাত।

স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, পূর্বাচলের প্রভাবশালী যুবদল নেতা রাজিব ও মানিক, লাভরাপাড়ার আবু হানিফ, চনপাড়ার শামীম,পিতলগঞ্জের নিকু দাস,মুসলা, তারাবোর শ্রাবন বাহীনি, গোলাকান্দাইলের আল আমিনগংদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্যাম্প পুলিশসহ প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে অবাধে চালায় মাদক বাণিজ্য৷ ফলে অধরা থেকে যায় মাদকে জড়িতরা।

পূর্বাচলের ৭০ বছর বয়সী আলফত আলী বলেন, চোলাই মদ বা বাংলা মদ গরীব মাতালদের জন্যে তৈরি হয়। এটার বাজেট কম। মাত্র ১ হাজার টাকা লিটারে পাওয়া যায়৷ তাছাড়া উপকরনের খরচও কম। এটাকে বহু মানুষ পেশা হিসেবে নিয়েছে। ফলে গ্রামের ৮০ ভাগ মানুষের নামে মামলা চলমান। কিন্তু মাদক কারবার বন্ধ হয় না। চোলাই মদের তৈরী প্রক্রিয়া বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, চোলাই মদ চুলায় জ্বাল দেয়। এর প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয় চিটাগুড়, ইস্ট, রাসায়নিক উপাদান ও স্পিরিট। মাটির নিচে তৈরি চুলায় কয়েকদিন ধরে পচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদন করা হয় বাংলা মদ। পরে এতে পানি মিশিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

দাউদপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক নয়ন সরকার বলেন, মদের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে  মামলা হলেও তারা গ্রেপ্তারের পর  জামিনে বের হয়ে ফের মদ তৈরীকে জড়িয়ে যায়। এতে সামাজিক আন্দোলনেও মাদক বন্ধ করা যায় না। আমরা খবর পেলেই নারায়ণগঞ্জ ১ রূপগঞ্জ আসনের এমপি মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপুর নির্দেশে দলবেঁধে মাদক বন্ধে হানা দেই। চেষ্টা করি এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে। পাশাপাশি অনেককে বুঝিয়ে মাদক থেকে ফেরানোর চেষ্টাও করেছি।

তথ্যমতে, শুধু পূর্বাচলই নয়৷ উপজেলার চনপাড়া,রূপসী বালু ঘাট, পিতলগঞ্জ মনিপাড়া, গুতিয়াবো আনন্দ হাউজিং বালির মাঠ, গোয়ালপাড়া,মাইজপাড়া, বাড়িয়াছনি, পশ্চিম গাও, খামার পাড়া, নাওড়া ব্রিজ, ইছাখালী ব্রিজ, দড়িকান্দি, হোড়গাও, পাড়াগাও, আমলাবো, গোলাকান্দাইল, কেন্দুয়া খালপাড়, বিরাবো, ভোলাবো, খৈসাইর, জাঙ্গীর  গ্রামের  প্রায় শতাধিক স্পটে সক্রিয় মাদককারবারি চক্র। মাঝেমধ্যে পুলিশের অভিযান কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ মাদক। সম্প্রতি উপজেলার লাভরা পাড়া ও চনপাড়া থেকে গাজা,ইয়াবা, ফেন্সিডিল উদ্ধার হয় অগণিত। তবে মাঝে মধ্যে মাদক সরঞ্জাম,উপকরন উদ্ধার করলেও আইনি পদক্ষেপ নিতে বিপাকে পড়েন তারা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, আমরা সম্প্রতি একাধিক অভিযান করেছি। বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছি। পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছি। মামলা হয়েছে। কিন্তু পুলিশকে আরও তৎপর হতে হবে। রূপগঞ্জকে স্বপ্নের রূপগঞ্জ গড়তে আমাদের এমপি মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপুর নির্দেশনায় মাঠে রয়েছি। রূপগঞ্জ মাদকমুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।

এসব বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি এএইচ এম সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা যে কোন মাদকের তথ্য পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেই। মাদক উদ্ধার করি। কারবারিও গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। রূপগঞ্জে পুলিশ তৎপর রয়েছেন। তবে পূর্বাচলের চোলাই মদ পেলে মামলা দেয়া যায়। উপকরণ বা কারখানা বিষয়ে ম্যাজিস্টেট মহোদয়গণের হস্তক্ষেপ দরকার পড়ে। তারা ব্যবস্থা নিলে আমরা আইন শৃঙ্খলা বাহীনির সদস্যরা সহযোগিতা করে থাকি।
এ সময় তিনি আরও বলেন, অনেক সময়ে মাদককারবারিদের অবস্থান উপজেলার সীমান্ত এলাকায় হওয়ায় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপরপ্রান্তে চলে যায়। এতে পাশের থানার সাথে সমন্বয় করে আসামী ধরতে হয়।

পূর্বাচল পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ উপপরিদর্শক হারুন উর রশিদ বলেন, আমরা তাৎক্ষণিক মাদক স্পটে চলে গেলেও কারবারি পালিয়ে যায়। উপকরন,সরঞ্জাম পাই। কিন্তু তা নিয়ে মামলা দিতে সমস্যা হয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম বলেন,মাদক কারবারির সাথে কোন পুলিশ সদস্যের সহযোগীতা থাকলে বা সখ্যতা থাকলে শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। আর মাদক বন্ধে নানা পদক্ষেপে আমরা সব সময় তৎপর।

এসব বিষয়ে কথা বলে পূর্বাচল রাজস্ব সার্কেল ও সহকারী কমিশনার ভূমি ফরিদ আল সোহান বলেন, ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়েও মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন। আমরা কারখানা বিষয়ে জানলে আইনি ব্যবস্থা নেই। পূর্বাচলে শীঘ্রই মাদকবিরোধী অভিযান চালাবো।

স্থানীয়দের দাবী, প্রভাবশালী চক্রের ছঁত্রছায়ায় মাদক কারবার চলে আসায় কোন পদক্ষেপই কাজে আসছে না। এতে সামাজিক অবক্ষয় বেড়েই চলছে৷ একদিকে খুচরা মাদককারবারিরা গ্রেফতার হলেও পাইকারি কারবারী অধরা থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

পড়ুন:তারকাদের বিশ্বকাপ ভাবনা

দেখুন:জমি বিক্রি করে ৭.৫ কি. মি. জার্মান পতাকা বানালেন আমজাদ!

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন