বিজ্ঞাপন

বছরজুড়ে চাপে থাকবে ভোক্তা ও এনবিআর

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব আহরণে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআরকে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আহরণ করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিশেষজ্ঞরা জানান, বাজেটের নীতিগত কাঠামো শক্তিশালী হলেও তা বাস্তবায়নের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। সম্পদের চেয়ে বাজেটের আকার বড় করা হয়েছে। রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অনেক বেশি। ফলে অর্থবছর শেষে বিশাল আকারে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি থাকবে। অন্যদিকে, বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই হাঁসফাঁস অবস্থা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের। তাই বাড়তি করের জোগান দিতে গিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তাদের জীবনযাত্রায়। আর মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার পথনকশা না থাকায় এনবিআরের পক্ষেও লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। সব মিলিয়ে অর্থবছরজুড়ে সাধারণ মানুষ ও রাজস্ব বোর্ড উভয়কেই চরম চাপে থাকতে হবে।

বিজ্ঞাপন

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়বে। এনবিআরের নীতি বিভাগ এবং বাস্তবায়ন বিভাগ আলাদাভাবে কাজ করবে। দুর্নীতি কমিয়ে আনা হবে। এক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব কৌশলই হবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জিডিপির ৭ শতাংশের নিচে কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে বাংলাদেশ আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, জলবায়ু সহনশীলতা এবং শিল্প রূপান্তরে অর্থায়ন করতে পারবে না বাজেট এটি স্বীকার করেছে। পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, করভিত্তি সম্প্রসারণ, করছাড় পর্যালোচনা এবং করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করার প্রস্তাবও দিয়েছে। এগুলো যুক্তিসংগত সংস্কার। সাফল্য নির্ভর করবে নজরদারিযোগ্য সংস্কারসূচক, স্বচ্ছ কর-ব্যয় হিসাব, প্রণোদনার সময়সীমা এবং কর-ছাড়ের সঙ্গে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদনশীলতা ও আঞ্চলিক উন্নয়নের দৃঢ় সংযোগের ওপর।

এরই মধ্যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, চলতি অর্থবছরে প্রকৃত রাজস্ব আদায় প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। সেখান থেকে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যপূরণ করতে হলে প্রায় ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। সিপিডির মতে, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ, করজাল সম্প্রসারণ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন বাস্তবে সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় যে দুর্বলতা রয়েছে, তা দূর না করে শুধু উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে বছরের শেষে আবারও রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হবে এবং সরকারকে অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ছে এবং পরিস্থিতির শিগগিরই পরিবর্তন হবে এমন লক্ষণও নেই। এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের বিশাল এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করে অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে তারা এনবিআরকে রাজস্ব আহরণে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা দেওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তারা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না। দেশে মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষেরা। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার পথনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এই মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ নিয়ন্ত্রণে পথনকশা নেই। ফলে এনবিআরের পক্ষে লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে। সব মিলিয়ে অর্থবছরের পুরো সময়ই রাজস্ব আহরণে চাপে থাকবে। আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করতে হবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা অনেকটা অসম্ভবই।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রকৃত রাজস্ব আদায় এই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, লক্ষ্যমাত্রা যদি বাস্তবসম্মত না হয়, তখন সেটি বাস্তবায়নও সম্ভব হয় না। আর যখনই এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করা যায় না, তখনই বাজেটের শৃঙ্খলাটা নষ্ট হয়। তখন বাজেটে কোথা থেকে আয় আসবে, কোথায় ব্যয় হবে, এমন অনেক শৃঙ্খলার অভাব দেখা দেয়। আমাদের রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থায় ঐতিহাসিকভাবে ব্যর্থতা-দুর্বলতা রয়েছে। প্রতিবছরই চাহিদা অনুযায়ী একটি উচ্চমাত্রা রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। কিন্তু সেটি আমরা অর্জন করতে পারি না।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়। অতীতের মতো এবারও রাজস্ব আহরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের বাস্তবভিত্তিক পথনকশা অনুপস্থিত। ফলে কোনোভাবেই এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে হবে। ফলে প্রতিদিন এনবিআরকে ১ হাজার ৬৫৪ কাটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে আয়কর আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ৩৭ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা বেশি। মূল্য সংযোজন কর আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ৪০ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা বেশি। এতে সব মানুষের ওপর করের চাপ বাড়বে বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।

এ ছাড়া সম্পূরক শুল্ক আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বেশি। আমদানি শুল্কের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১০ হাজার ৫০১ কোটি টাকা বেশি। রপ্তানি শুল্কের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৯ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ২১ কোটি টাকা বেশি। আবগারি শুল্কের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা বেশি। অন্যান্য কর আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১ হাজার ১৪ কোটি টাকা বেশি।

রাজস্ব আহরণে তিন খাতেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। মধ্যবিত্তদের ওপর চাপটা থাকবে বেশি। তবে এ চাপ এনবিআরের জন্যও কম নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্কার ছাড়াই বিপুল রাজস্ব আদায় বরাবরের মতো এবারও চাপে থাকতে হবে এনবিআরকে। এ ছাড়া বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আহরণের জন্য যে ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন, নীতি সংস্কার এবং অন্যান্য সক্ষমতাÑ অনেক বেশি অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করেন তারা।

বাংলাদেশে কর্মরত মার্কিন ব্যবসায়ীদের সংগঠন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) মনে করে, রাজস্ব আহরণের বিষয়ে অ্যামচেম বলেছে, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কর প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ঋণনির্ভরতা কমাতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনের কার্যক্রম পৃথক করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানিয়েছে অ্যামচেম।

পড়ুন:প্যারাগুয়েকে হারিয়ে বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ল যুক্তরাষ্ট্র

দেখুন:কক্সবাজার পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী | 

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন