বিজ্ঞাপন

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ফেরদৌসের ৪৮ বছরের সংগ্রাম, ২ মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে মানবজীবনের এক হৃদয়স্পর্শী সংগ্রামের নাম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ফেরদৌস (৪৮)। জন্মের ৮ মাস পর থেকেই চোখে আলো নেই, জীবনের পথে ছিল না জমি, ছিল না ভিটেমাটি, ছিল না নিরাপদ আশ্রয়। তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। গত চার দশক ধরে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে কাটছে তার জীবন।

বিজ্ঞাপন

“জন্ম থেকে জলছি মাগো তোমার এই ভাঙা সংসারে” এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে তার জীবনের সমস্ত বেদনা। দুঃখ যার সঙ্গী, তার আবার সুখ কোথায়! তবুও হাল ছাড়েননি ফেরদৌস। অভাব, অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারকে সঙ্গী করেই লড়ে যাচ্ছেন প্রতিটি দিন।

বলছিলাম, শাহজাদপুর উপজেলার পোরজনা ইউনিয়নের কাকুড়িয়া গ্রামের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ফেরদৌসের কথা। ফেরদৌস একজন শিক্ষিত হয়েও এক স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তিনি ১৯৯৬ সালে সিরাজগঞ্জ শহরের এসবি রেলওয়ে কলোনী স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও ১৯৯৮ সালে শাহজাদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

পোরজনা ইউনিয়নের কাকুড়িয়া গ্রামের মৃত সিফাত আলীর ছেলে ফেরদৌস জন্ম পর ৮ মাস পর থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। জন্মের পর বাবা-মা দুইজনও মারা যায়। গ্রামে গিয়ে জানা যায়, পিতার কোনো পৈত্রিক ভিটেমাটি না থাকায় তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে রাস্তার পাশে সরকারি জায়গা, মামার বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে থাকার পর বর্তমানে শুশুর বাড়িতে একটি ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করছেন। তার সঙ্গী স্ত্রী নাজমা, দুই মেয়ে বড় খাদিজা (৮), ছোট মেয়ে সাদিয়া (৬) বছর। তারাই দুইজন স্থানীয় স্কুলে পড়া-শোনা করেন।

তাদের এই ছোট সংসারে নেই কোনো বিলাসিতা, নেই স্বস্তি। শুশুরের দেওয়া ১টি গাভী গরু লালন-পালন করে চলছে তার জীবন। কোনোমতে চলছে তাদের সংসার। কোনো দিন দু’বেলা খাবার জোটে, আবার কোনো দিন অভুক্ত থেকেও কাটাতে হয় দিন।

চোখে দেখতে না পারলেও ফেরদৌসের মেধা ও অনুভূতির শক্তি বিস্ময়কর। নিজেই গরুর জন্য ঘাষ কেটে নিয়ে আসেন। নিজেই খর কেটে গরুকে দেন। নিজেই একা একা নামাজ পড়তে যান। এছাড়াও হাতে টাকা নিয়ে স্পর্শেই বুঝে ফেলতে পারেন কত টাকার নোট। মানুষের মুখ না দেখেও অনুভব করেন তাদের কণ্ঠ, আচরণ ও মন। জীবনের কঠিন বাস্তবতাই যেন তাকে দিয়েছে অন্য এক দৃষ্টি। ফেরদৌসের জীবনের আরেকটি করুণ অধ্যায় তার স্ত্রী। তার স্ত্রী কিছুটা বোকা ধরণের। এই কারণে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ফেরদৌস বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জীবন চরম চ্যালেঞ্জে ভরা। সরকারি সহায়তা হিসেবে প্রতিবন্ধী ভাতা পান, মাসে ৯শত টাকা। এছাড়াও স্থানীয় এমপি বর্তমান স্বাস্থ্যপ্রতি মন্ত্রী ড. এম এ মুহিত তাকে গত ২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাসিক কিছু টাকা সহায়তা করেন। তবে তা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব।

ফেরদৌস কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরো বলেন, “বাবার কোনো ভিটা মাটি পাইনি। সরকারি জায়গায়সহ বিভিন্ন স্থানে কষ্টে বসবাস করেছি। জন্ম থেকে যুদ্ধ করে দিন পার করছি। নিজের সুখের কথা ভাবি না। শুধু চাই, আমার দুইটি মেয়েদের যদি একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতাম, তাহলে আর চিন্তা থাকত না।” তার এই আকুতি শুধু একটি ঘর নয়, এটি নিরাপত্তার আবেদন, মর্যাদার আবেদন, শেষ বয়সে মেয়েদের মুখে একটু নিশ্চিন্ত হাসি দেখার আবেদন।

পড়ুন- রামিসা হত্যা মামলা: আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন