বিজ্ঞাপন

খুলনায় নদী খননের মাটিতে চাপা পড়ছে শতাধিক গৃহহীনের স্বপ্ন

ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান নদী খনন প্রকল্প একদিকে যেমন হাজারো মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের আশা জাগিয়েছে, অন্যদিকে সেই প্রকল্পের খননকৃত মাটির নিচেই চাপা পড়ছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার শতাধিক গৃহহীন পরিবারের স্বপ্ন। বুড়িভদ্রা নদী খননের মাটি ফেলার কারণে উপজেলার চুকনগর ও কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা এখন চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া পরিবারগুলোর অনেকেই আবারও গ্রহহীন হয়ে পড়েছেন। কেউ খোলা মাঠে অস্থায়ী ঝুপড়িতে বসবাস করছেন, আবার কেউ ঘরের দেয়াল ফেটে যাওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরকার ১৪৫টি ঘর নির্মাণ করে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করেছিল। কিন্তু বুড়িভদ্রা নদী খনন শুরু হওয়ার পর প্রকল্পের ১৪৩টি ঘর উচ্ছেদ করা হয়। বর্তমানে সেখানে অক্ষত রয়েছে মাত্র দুটি ঘর। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর সদস্যরা এখন চুকনগর বাজারসংলগ্ন গরুর হাটের খোলা মাঠে টিন, পলিথিন ও কাপড় দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঝুপড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হাজিরা বেগম বলেন, “নদী কাটার সময় ঘরের ওপর মাটি ফেলা হয়েছে। ঘরগুলো বাঁচাতে পারিনি। এখন খোলা মাঠে পরিবার নিয়ে থাকছি।”
আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন জানান, প্রায় এক হাজার মানুুষ কয়েক মাস ধরে খোলা মাঠে বসবাস করছে। সেখানে নেই বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
চুকনগরের ঘটনা এখনও সমাধান না হতেই নতুন সংকটে পড়েছেন বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। প্রকল্পসংলগ্ন নদীর পাড়ে বিপুল পরিমাণ খননকৃত মাটি স্তুপ করে রাখায় তা বৃষ্টির পানিতে ধসে ঘরগুলোর ওপর পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পলিমাটির চাপে বহু ঘরের দেয়াল, জানালা ও বারান্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরের মেঝে ও দেয়ালে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। কয়েকটি পরিবার তাদের আসবাবপত্র ঘর থেকে বের করে খোলা আকাশের নিচে রাখতে বাধ্য হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, অন্তত ১০টি ঘর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে বাসিন্দাদের চলাচলের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
বাসিন্দা কৌশলা দাস বলেন, “নদী খননের মাটি ঘরের ওপর ফেলেছে। এখনও মাটি আছে। বৃষ্টিতে আরও ভয় লাগে।”
ময়না বেগমের অভিযোগ, “মাটির চাপে ঘরের দেয়াল ফেটে গেছে, জানালার ক্ষতি হয়েছে। শিশুদের নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারছি না।”
৬৫ বছর বয়সী রহিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “নদী ভাঙনে সব হারিয়ে এখানে আশ্রয় পেয়েছিলাম। এখন আবার সেই ঘরও ভেঙে যাচ্ছে। রাতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় মাটি চাপা পড়ে যাব।”
স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা বেগম জানান, কয়েকদিন আগে ভারী বৃষ্টির সময় মাটির স্তুপ ধসে তিন বছরের একটি শিশু চাপা পড়ে। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করায় শিশুটি প্রাণে বেঁচে যায়।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্থানীয় একটি ইটভাটার মালিক খননকৃত মাটি কিনলেও তা দ্রুত অপসারণ না করায় দীর্ঘদিন ধরে মাটির স্তুপ পড়ে ছিল। ফলে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট ইটভাটার ম্যানেজার কৃষ্ণপদ মন্ডল দাবি করেন, অধিকাংশ মাটি ইতোমধ্যে সরানো হয়েছে এবং অবশিষ্ট অংশও দ্রুত অপসারণ করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, খুলনা ও যশোর অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খননকাজ চলছে।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী জানান, ভবদহ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য শ্রী, মুক্তেশ্বরী, টেকা ও হরি নদী খনন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৫৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, “খননের মাটি ঘরের পাশে রাখার কারণে কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পে পুনর্বাসনের জন্য আলাদা কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। তবে মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করে দেওয়া হবে।”

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর ক্ষতির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে।
তিনি বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাটি অপসারণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। তবে চুকনগর থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়ে এখনও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।”

খনন প্রকল্পের ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মামুনুর রশিদ বলেন, নিলামে বিক্রি হওয়া মাটি দ্রুত সরিয়ে ফেলার দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্টদের। তা যথাসময়ে না হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে মাটি অপসারণ এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত মঙ্গলবার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেন খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, “সরকার জনগণের কল্যাণে নদী খননের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে কোনো প্রকল্পের কারণে যদি সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।”

ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে নদী খনন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে যদি আশ্রয়ণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীরাই আবার গৃহহীন হয়ে পড়েন, তবে তা উন্নয়নের মানবিক দিক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
চুকনগরের খোলা মাঠে বসবাসরত শত শত মানুষের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন সরকার যে ঘর দিয়েছিল, সেই ঘরে তারা আবার কবে ফিরতে পারবেন? আর বরাতিয়ার বাসিন্দারা অপেক্ষা করছেন, তাদের ফাটল ধরা ঘরগুলো আদৌ নিরাপদ হবে কি না, সেই উত্তরের জন্য।

পড়ুন- তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ সরকারের নানা উন্নয়ন উদ্যোগের কথা সংসদে জানালেন প্রধানমন্ত্রী

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন